তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘এবরাত জাদুঘর’ এক সময় ছিল ইরানের সবচেয়ে কুখ্যাত কারাগার। এটি শুধু নির্যাতনের জন্যই নয়, বরং ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে পরিচিত। এই কারাগারেই বন্দি ছিলেন বর্তমান ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ পদে রয়েছেন এবং বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে বিবেচিত।
ইসলামি বিপ্লব-পূর্ব সময়ে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনামলে আয়াতুল্লাহ খামেনি ছয়বার গ্রেপ্তার হন। ১৯৭৫ সালে সাভাক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি দীর্ঘ সময় এই কারাগারে বন্দি ছিলেন। সে সময় এই কারাগারটি ‘জয়েন্ট কমিটি এগেইনস্ট সাবোটাজ’ নামে পরিচিত ছিল। বর্তমান ‘এবরাত জাদুঘর’ নামের এই ভবনে এখন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে একটি বিশেষ প্রদর্শনী—যেখানে খামেনির বন্দি জীবনের নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। রয়েছে তাঁর মোমের প্রতিকৃতি, ছবি এবং ব্যাখ্যাসহ ইতিহাস।
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ইসলামি বিপ্লবের পক্ষে আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় খামেনি একাধিকবার নির্যাতনের শিকার হন। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের শীতে তাঁর বাড়িতে সাভাক বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং দীর্ঘ সময় তেহরানের এই কারাগারে আটক রাখে। নিজ বিবরণে তিনি একে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় বলে উল্লেখ করেছেন।
এই কারাগারটি কেবল খামেনির স্মৃতিবহ নয়; এখানে বন্দি ছিলেন অসংখ্য ইসলামি চিন্তাবিদ ও নারী, যারা শাহ সরকারের কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এমনকি, হিজাব পরা নারীদেরকেও তখন গ্রেপ্তার করা হতো। আজ জাদুঘরের দেয়ালে রয়েছে সেইসব নারীদের ছবিও।
কারাগারটির নির্মাণ শুরু হয় ১৯৩২ সালে, রেজা শাহ পাহলভির আমলে, জার্মান প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে। ২০০০ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ২০০২ সালে এটি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। ভবনটি ভূমিকম্প প্রতিরোধক এবং কেন্দ্রীয় উঠান ঘিরে চারতলা বিশিষ্ট। এখানে রয়েছে একক সেল, নির্যাতন কক্ষ, সাক্ষাৎ কক্ষ ও বন্দিদের পোশাক ঘর। দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছিল এমনভাবে, যেন ভেতরের কোনো আওয়াজ বাইরে পৌঁছাতে না পারে।
জাদুঘরে মোমের পুতুল দিয়ে বন্দিদের ওপর চালানো নির্যাতনের প্রতীকী দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রয়েছে সাবেক বন্দিদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র, ঐতিহাসিক দলিল এবং ছবি। ইংরেজি ভাষায় গাইডেড ট্যুর এবং সাবেক বন্দিদের অভিজ্ঞতা সরাসরি শোনার ব্যবস্থাও রয়েছে।
‘এবরাত জাদুঘর’ এখন শুধু অতীতের নৃশংসতার স্মারক নয়, বরং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক প্রতীক, যা মানবাধিকার সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























