দুই দশকেরও বেশি সময়ের এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের সমাপ্তি টানলেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন এক বার্তায় নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর থেকেই মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক-নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে স্পেন।
সেই ফাইনালের দুই দিন পরই নিজের বিদায়ের কথাগুলো লিখে রেখেছিলেন মেসি। তবে তখন তা প্রকাশ করেননি। এক মাসেরও বেশি সময় পর এবার সেই চিঠিই প্রকাশ করে জানিয়ে দিলেন, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাকে।
মেসি লিখেছেন,
ফাইনালের পর এতটা সময় কেটে যাওয়ার পর এবং অনেক ভেবে আমি সবাইকে জানাতে চাই, আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি। সিদ্ধান্তটি নিতে খুব কষ্ট হয়েছে এবং এখনো আত্মায় ব্যথা দেয়। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়।
আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের নিবেদন নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। মেসির ভাষায়, ‘আমি শপথ করে বলতে পারি, সব সময় নিজের সবটুকু দিয়েছি। শুধু শেষ কয়েক বছরে, যখন আমরা সবকিছু জিতেছি, তখন নয়; তার আগেও। এই জার্সির জন্য সব সময় লড়েছি, সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। ফুটবলের মাধ্যমে আপনাদের আনন্দ দিতে এবং আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত করতে চেয়েছি।’
বিদায়ের সিদ্ধান্তের পেছনে নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
‘সময় খুব বেশি বাকি নেই, একে একে অধ্যায়গুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। এটাও এমন একটি অধ্যায়, যেটি শেষ করতে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। জাতীয় দলে থাকতে আমি ভালোবাসি, ভালোবেসেছি এবং সব সময় ভালোবাসব। আমি নিজেকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিয়েছি। আমার আর কিছু দেওয়ার নেই। আর পেছনে দারুণ কিছু তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা এই জায়গার যোগ্য।’
সমর্থকদের উদ্দেশে মেসি লিখেছেন, ‘এই ২০ বছরের ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। মাঠের ভেতর থেকে আপনাদের আওয়াজ শোনা খুব মিস করব। এখন থেকে আমি আপনাদেরই একজন। বাইরে থেকে সব সময় সমর্থন করে যাব, ভালো সময়ে এবং খারাপ সময়ে আরও বেশি।’
পরিবার, কোচ, সতীর্থ ও আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন মেসি। বিদায়ী বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারকে ধন্যবাদ, সব সময় পাশে থাকার জন্য এবং এত সুন্দর কিন্তু কঠিন এই যাত্রায় সঙ্গ দেওয়ার জন্য। যেসব কোচ, সতীর্থ ও কর্মকর্তার সঙ্গে পথচলা হয়েছে, সবাইকে ধন্যবাদ। অসংখ্য স্মৃতি এবং অবিস্মরণীয় মুহূর্ত সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।’
বিদায়ের সময় নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তির কথাও স্মরণ করেছেন মেসি, ‘আমি শান্তি ও গর্ব নিয়ে বিদায় নিচ্ছি, কারণ সতীর্থদের সঙ্গে মিলে আপনাদের এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দিতে পেরেছি, যেগুলো আমরা স্বপ্নেও দেখেছি। আপনাদের সঙ্গে এগুলো অনুভব করাটা ছিল পাগলাটে এক অভিজ্ঞতা। আপনাদের ভালোবাসি।’
তবে বার্তার শেষের কয়েকটি লাইন আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। মেসি জানিয়েছেন, ‘এই কথাগুলো আমি ২১ জুলাই, ফাইনালের দুই দিন পর লিখেছিলাম। আজ আমার বাবার সঙ্গে যা হয়েছে, তার পর সিদ্ধান্তটি নিয়ে আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত আমি।’
মেসির বাবা হোর্হে মেসি গত ৮ আগস্ট রোসারিওতে ৬৮ বছর বয়সে মারা যান। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন তিনি এবং ছেলের ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন। বাবার মৃত্যুর কয়েক দিন পর আবেগঘন বার্তায় নিজের ফুটবল ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয়ের কথা জানিয়েছিলেন মেসি।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেক হয়েছিল মেসির। এরপর দুই দশকের যাত্রায় দেশকে জিতিয়েছেন ২০২২ বিশ্বকাপ এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকা। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে। শেষ পর্যন্ত শিরোপা ধরে রাখতে না পারলেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবেই শেষ হচ্ছে তার আন্তর্জাতিক অধ্যায়।
একসময় যে জার্সিতে বড় শিরোপা না জেতার আক্ষেপ ছিল তার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা, সেই জার্সিই শেষ পর্যন্ত তাকে দিয়েছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে অমর এক অধ্যায়। এবার সত্যিই সেই আকাশি-সাদা জার্সিকে বিদায় বললেন লিওনেল মেসি।

ডেস্ক রিপোর্ট 








