যুদ্ধের তীব্রতায় বদলে গেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের চোরাচালানের ধরন। দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও বিভিন্ন পণ্য পাচার হলেও রাখাইন রাজ্যে সংঘাত বাড়ার পর তৈরি হয়েছে নতুন এক আন্তঃসীমান্ত অবৈধ বাণিজ্য। সীমান্তের ওপারে খাদ্য, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রীর সংকটকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য পাচার করা হচ্ছে। আর বিনিময়ে দেশে আসছে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অবৈধ বাণিজ্য এখন শুধু নাফ নদকেন্দ্রিক নয়। বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ নৌপথও ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। এমনকি মাছ ধরার ট্রলারও হয়ে উঠেছে পাচারের বাহন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক মাজহারুল ইসলাম জানান, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইনে নানা পণ্যের সংকট তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র ‘পণ্য বিনিময় পদ্ধতিতে’ পাচার চালাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, খাদ্যপণ্য, ওষুধ ও গৃহস্থালি সামগ্রী পাচারের পর বিনিময়ে ইয়াবা ও আইসসহ মাদক দেশে আনা হচ্ছে।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত তীব্র হওয়ার পর রাখাইনের যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। কেন্দ্রীয় মিয়ানমার থেকে পণ্য সরবরাহে বিধিনিষেধ তৈরি হওয়ায় সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটও বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়ার পাশাপাশি অবৈধ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেন্টমার্টিনের কাছে কোস্ট গার্ডের অভিযানে মিয়ানমারমুখী দুটি নৌযান থেকে ১ হাজার ৬০০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ এবং ১৮ জনকে আটক করা হয়। কয়েক দিন পর আরেক অভিযানে ১ হাজার ১৪০ বস্তা সিমেন্ট, রসুন, ছোলা, আলু ও ৭ হাজার ৮০টি এনার্জি ড্রিংকসসহ ১৯ জনকে আটক করা হয়।
এরপর ২৯ জুলাই ভাসানচরসংলগ্ন গাংগুরিয়া চরে একটি কার্গো বোট থেকে ২৪ হাজার কেজি ইউরিয়া সার, ৩ হাজার ৭০০ কেজি ছোলা ও ৬ হাজার ৮৫০ কেজি বুটের ডাল জব্দ করে কোস্ট গার্ড। এসব পণ্য মিয়ানমারের সিতওয়ে এলাকায় নেওয়ার কথা ছিল।
সিমেন্টই কেন পাচারকারীদের বড় টার্গেট?
রাখাইনে নির্মাণসামগ্রীর সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের সিমেন্ট চোরাকারবারিদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
গত ৪ জুন সেন্টমার্টিনের কাছে পাঁচটি মাছ ধরার নৌকা থেকে ১ হাজার ৪৫০ বস্তা সিমেন্টসহ ৫২ জনকে আটক করা হয়। এর মাত্র দুই দিন আগে একই এলাকায় দুটি নৌযান থেকে ১ হাজার ৭০০ বস্তা সিমেন্টসহ ২০ জনকে আটক করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টাকা দামের এক বস্তা সিমেন্ট রাখাইনে প্রায় ১ লাখ মিয়ানমার কিয়াটে বিক্রি হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে কয়েক গুণ বেশি দামের কারণে ঝুঁকি নিয়েও সিমেন্ট পাচারে আগ্রহী হচ্ছে চোরাকারবারিরা।
সমুদ্রপথে বাড়ছে চোরাচালান
উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে নজরদারি বাড়ায় চোরাকারবারিরা এখন সমুদ্রপথকে বেশি ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। মহেশখালী, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, আনোয়ারা ও কুয়াকাটাসহ উপকূলীয় বিভিন্ন রুটে মাদক প্রবেশের প্রবণতা বাড়ছে।
কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, অভিযানে মিয়ানমারে পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশি পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এসব পণ্য পাচারের পর বিনিময়ে দেশে মাদক আনার চেষ্টা করছে চোরাকারবারিরা। ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও আইসও জব্দ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, রাখাইনের যুদ্ধ শুধু সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই বদলাচ্ছে না; এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের অবৈধ বাণিজ্যের পথ, পণ্য ও লেনদেনের ধরনেও।

ডেস্ক রিপোর্ট 





















