ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
আগামী ২৫ বছর গ্রীষ্মকালে হবে না পবিত্র হজ রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন: নাহিদ ইসলাম  গ্যাস্ট্রিক-ক্যানসার বলে মিথ্যা অসুস্থতার সার্টিফিকেট দিয়েছেন কামরুল ইসলাম: চিফ প্রসিকিউটর মাদকের টাকার জন্য নিজের ঘরের টিনের বেড়া খুলে নিলেন যুবক পুরোনো ছবি দিয়ে অপপ্রচার, বাস্তবে ডুবে যায়নি চট্টগ্রাম: প্রতিমন্ত্রী টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ৭ হাজার একর জমির ধান, দিশেহারা কৃষকরা তুরস্কে কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি ক্বারীর বিশ্বজয় নিউজিল্যান্ডের মসজিদে ৫১ মুসল্লিকে হত্যা: আদালতে আসামির আপিল খারিজ গণভোটের দাবি বাস্তবায়নে ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচি ঘোষণা জামায়াত অপরাধ স্বীকার না করা পর্যন্ত ‘মুক্তিযুদ্ধ কার্ড’ থাকবে: জাহেদ উর রহমান

মার্কিন সেনাদের সঙ্গে রক্তের সমুদ্রে লড়তে চায় ইরান

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:২৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫৫ বার পড়া হয়েছে

এবার ইরানে স্থল অভিযান চালালে মার্কিন সেনারা শুধু ছদ্মবেশী জঙ্গি বা লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদেরই মুখোমুখি হবে না; তাদের সামনে দাঁড়াবে একটি সুসংগঠিত ও বিপুলসংখ্যক যোদ্ধার বাহিনী, যারা মাতৃভূমি রক্ষাকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে দেখে। গত চার দশকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রতিরক্ষার এই কাঠামো গড়ে তুলেছে তেহরান। এই বিষয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলে নেওয়ার নির্দেশ দেন, তবে তা হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক সামরিক অভিযান। এই পরিকল্পনায় মার্কিন বাহিনীকে ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে, যা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত জটিল।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিস এই ধরনের অভিযানেইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশেষ বাহিনীর অপারেশনপ্রয়োজন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। কারণ, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যা মার্কিন বাহিনীর জন্য পৌঁছানো ও নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কঠিন। প্রথমত, এই স্থাপনাগুলো পারস্য উপসাগরের মার্কিন ঘাঁটি বা বিমানবাহী জাহাজ থেকে প্রায় ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত, যা সরবরাহ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় বাধা। দ্বিতীয়ত, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান নিজেই একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। পশ্চিম ইরানজুড়ে বিস্তৃত জাগ্রোস পর্বতমালা প্রাকৃতিক প্রাচীরের মতো কাজ করে, যা উপকূল থেকে দেশটির ভেতরে প্রবেশকে কঠিন করে তোলে।

ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল মূলত বহু স্তরভিত্তিক। দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র দূর থেকে শনাক্ত ও ধ্বংস করার চেষ্টা করে। মাঝারি স্তরে রয়েছে মোবাইল প্রতিরক্ষা ইউনিট, যা যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল মোকাবিলা করে। পাশাপাশি, সৈন্যদের হাতে থাকা পোর্টেবল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও হেলিকপ্টার ও নিম্নউচ্চতার বিমান প্রতিহত করতে সক্ষম। এই প্রতিরক্ষার মূল দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কৌশল তৈরি করে আসছে। এই কৌশলের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ইরাকের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে।

ইরান দাবি করেছে, তাদের প্রতিরক্ষায় প্রায় ১০ লাখ যোদ্ধা প্রস্তুত রয়েছে, যার মধ্যে আইআরজিসি, বাসিজ মিলিশিয়া ও স্বেচ্ছাসেবকেরা অন্তর্ভুক্ত। এই বাহিনীর কার্যকারিতা পুরোপুরি অজানা হলেও সংখ্যার দিক থেকে এটি যে কোনো দখলদার বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসহাক জাহাঙ্গিরি সতর্ক করে বলেছেন, স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভুল হবে। তাঁর ভাষায়, ইরানের এক ইঞ্চি জমি দখল করতে হলেওরক্তের সাগরপাড়ি দিতে হবে। অভিযানের আরেকটি জটিল দিক হলো ইউরেনিয়াম অপসারণ। প্রায় ৪৫০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিবহন করতে বিশেষ সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। তা ছাড়া, এই উপাদান বিভিন্ন স্থানে ও ভিন্ন আকারে ছড়িয়ে রয়েছে। এগুলোর কিছু গ্যাসীয়, কিছু ধাতব বা পাউডার আকারে, এমনকি বোমাবর্ষণের পর ধ্বংসস্তূপের নিচেও রয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।

এদিকে, ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালালে তা আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি, উপসাগরীয় অবকাঠামো এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি এবং বাব আলমানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসে এর কাছাকাছি উদাহরণ হিসেবে ১৯৮০ সালের একটি ব্যর্থ মার্কিন উদ্ধার অভিযানের কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে অল্পসংখ্যক সেনা নিয়ে তেহরানে জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়ে বিপর্যয় ঘটেছিল। সেই তুলনায় বর্তমান পরিকল্পনা অনেক বড় ও জটিল। সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য এই সংঘাত এমন এক পরীক্ষা, যার মুখোমুখি এর আগে কখনো হয়নি কোনো পক্ষই। তবে সামরিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতায়, এই লড়াইয়ে ইরানই আপাতত অধিক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

আগামী ২৫ বছর গ্রীষ্মকালে হবে না পবিত্র হজ

মার্কিন সেনাদের সঙ্গে রক্তের সমুদ্রে লড়তে চায় ইরান

আপডেট সময় ১০:২৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

এবার ইরানে স্থল অভিযান চালালে মার্কিন সেনারা শুধু ছদ্মবেশী জঙ্গি বা লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদেরই মুখোমুখি হবে না; তাদের সামনে দাঁড়াবে একটি সুসংগঠিত ও বিপুলসংখ্যক যোদ্ধার বাহিনী, যারা মাতৃভূমি রক্ষাকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে দেখে। গত চার দশকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রতিরক্ষার এই কাঠামো গড়ে তুলেছে তেহরান। এই বিষয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলে নেওয়ার নির্দেশ দেন, তবে তা হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক সামরিক অভিযান। এই পরিকল্পনায় মার্কিন বাহিনীকে ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে, যা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত জটিল।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিস এই ধরনের অভিযানেইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশেষ বাহিনীর অপারেশনপ্রয়োজন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। কারণ, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যা মার্কিন বাহিনীর জন্য পৌঁছানো ও নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কঠিন। প্রথমত, এই স্থাপনাগুলো পারস্য উপসাগরের মার্কিন ঘাঁটি বা বিমানবাহী জাহাজ থেকে প্রায় ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত, যা সরবরাহ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় বাধা। দ্বিতীয়ত, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান নিজেই একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। পশ্চিম ইরানজুড়ে বিস্তৃত জাগ্রোস পর্বতমালা প্রাকৃতিক প্রাচীরের মতো কাজ করে, যা উপকূল থেকে দেশটির ভেতরে প্রবেশকে কঠিন করে তোলে।

ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল মূলত বহু স্তরভিত্তিক। দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র দূর থেকে শনাক্ত ও ধ্বংস করার চেষ্টা করে। মাঝারি স্তরে রয়েছে মোবাইল প্রতিরক্ষা ইউনিট, যা যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল মোকাবিলা করে। পাশাপাশি, সৈন্যদের হাতে থাকা পোর্টেবল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও হেলিকপ্টার ও নিম্নউচ্চতার বিমান প্রতিহত করতে সক্ষম। এই প্রতিরক্ষার মূল দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কৌশল তৈরি করে আসছে। এই কৌশলের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ইরাকের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে।

ইরান দাবি করেছে, তাদের প্রতিরক্ষায় প্রায় ১০ লাখ যোদ্ধা প্রস্তুত রয়েছে, যার মধ্যে আইআরজিসি, বাসিজ মিলিশিয়া ও স্বেচ্ছাসেবকেরা অন্তর্ভুক্ত। এই বাহিনীর কার্যকারিতা পুরোপুরি অজানা হলেও সংখ্যার দিক থেকে এটি যে কোনো দখলদার বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসহাক জাহাঙ্গিরি সতর্ক করে বলেছেন, স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভুল হবে। তাঁর ভাষায়, ইরানের এক ইঞ্চি জমি দখল করতে হলেওরক্তের সাগরপাড়ি দিতে হবে। অভিযানের আরেকটি জটিল দিক হলো ইউরেনিয়াম অপসারণ। প্রায় ৪৫০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিবহন করতে বিশেষ সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। তা ছাড়া, এই উপাদান বিভিন্ন স্থানে ও ভিন্ন আকারে ছড়িয়ে রয়েছে। এগুলোর কিছু গ্যাসীয়, কিছু ধাতব বা পাউডার আকারে, এমনকি বোমাবর্ষণের পর ধ্বংসস্তূপের নিচেও রয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।

এদিকে, ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালালে তা আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি, উপসাগরীয় অবকাঠামো এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি এবং বাব আলমানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসে এর কাছাকাছি উদাহরণ হিসেবে ১৯৮০ সালের একটি ব্যর্থ মার্কিন উদ্ধার অভিযানের কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে অল্পসংখ্যক সেনা নিয়ে তেহরানে জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়ে বিপর্যয় ঘটেছিল। সেই তুলনায় বর্তমান পরিকল্পনা অনেক বড় ও জটিল। সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য এই সংঘাত এমন এক পরীক্ষা, যার মুখোমুখি এর আগে কখনো হয়নি কোনো পক্ষই। তবে সামরিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতায়, এই লড়াইয়ে ইরানই আপাতত অধিক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।