এবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় চিকিৎসা নিতে বাংলাদেশি রোগীদের আসা কমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে শহরটির হাসপাতালগুলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কয়েকটি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ। এসব দলের সদস্যরা রোগী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে হোটেল বুকিংয়ের বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ছাড়পত্র রয়েছে—এমন হোটেল বা থাকার জায়গাগুলোতেই যাতে রোগীরা ওঠেন, তা নিশ্চিত করতেও তাদের সহায়তা করবে ওই প্রতিনিধি দল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, বাংলাদেশি রোগীদের আবাসনের সমস্যা কমাতে কলকাতার অনেক হাসপাতালই নিজেদের আশপাশের হোটেল ও লজের সঙ্গে চুক্তি করছে। বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি সতর্কবার্তার পরই এই উদ্যোগ নিয়েছে হাসপাতালগুলো। কলকাতায় ভ্রমণকারীদের নিরাপদ হোটেলে আগে থেকেই রুম বুক করার এবং বৈধ সব অনুমোদন রয়েছে—এমন হোটেলে থাকার পরামর্শ দিয়েছে হাইকমিশন। পরামর্শে বলা হয়েছে, কলকাতায় যাওয়ার আগেই হোটেল বুক করতে হবে। মূলত সম্প্রতি কলকাতার নিউ মার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি গেস্টহাউসে ভয়াবহ আগুনে ৯ জনের মৃত্যুর পর কলকাতার কম খরচের হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজনই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ হাইকমিশন ওই পরামর্শ দিয়েছে।
কলকাতার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মনে করছে, বাংলাদেশি রোগীদের বড় একটি অংশের জন্য হাইকমিশনের এই পরামর্শ মেনে চলা কঠিন হতে পারে। কারণ, তাদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য সড়কপথে কলকাতায় আসেন এবং কলকাতা ও আশপাশে কম খরচের আবাসন খোঁজেন। ফলে অনেক সময় তারা যথাযথ অনুমোদন বা নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই—এমন আবাসনেও উঠে পড়েন। এমন অবস্থায় কলকাতার বিপি পোদ্দার হাসপাতালের কর্মকর্তাদের একটি দল আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশে যাবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কলকাতায় হাসপাতালটির কাছেই বাংলাদেশি রোগীদের জন্য নিজস্ব আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলছে হাসপাতালটি। বিপি পোদ্দার হাসপাতালের গ্রুপ উপদেষ্টা সুপ্রিয় চক্রবর্তী বলেন, ‘রোগীদের চিকিৎসার যাত্রা আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত করতে আমরা হাসপাতালের আশপাশে থাকার ব্যবস্থা করছি। রোগীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাসপাতালের পাশেই নির্দিষ্ট আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজও চলছে। সেখানে পরিকল্পিত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। খুব শিগগিরই এসব আবাসন চালু হবে বলে আশা করছি।’
উডল্যান্ডস মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালও বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশি রোগীদের জন্য আলিপুর এলাকায় একাধিক গেস্টহাউস ও হোটেলের সঙ্গেও চুক্তি করেছে হাসপাতালটি। উডল্যান্ডসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব হসপিটালস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার (এএইচইআই) সভাপতি রূপক বড়ুয়া বলেন, ‘নিরাপদ হোটেলে থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা তাদের সচেতন করতে চাই। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আমাদের হাসপাতালে আসবেন—এমন রোগীদের আলিপুর এলাকার গেস্টহাউস ও হোটেলগুলোর একটি তালিকা আমরা পাঠাচ্ছি। বাংলাদেশ হাইকমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী, ভ্রমণের আগেই তারা যাতে কক্ষ বুক করতে পারেন, সে জন্যই এই ব্যবস্থা। ইতোমধ্যে কেউ কেউ আমাদের সহায়তা চেয়েছেন, আবার কেউ কেউ নিজেরাই কক্ষ বুক করেছেন।’ এর আগে বাংলাদেশি রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে প্রতিনিধি দল পাঠানো রুবি জেনারেল হাসপাতালও এবার রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি বিশেষ ডেস্ক চালু করছে।
রুবি জেনারেল হাসপাতালের প্রধান মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) সুভাষিস দত্ত বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি এবং হাসপাতালের কাছাকাছি থাকার জায়গাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করেছি। এসব জায়গা নিরাপদ। ভ্রমণের আগে রোগীরা যাতে কক্ষ বুক করতে পারেন, সে ক্ষেত্রেও আমরা সহায়তা করছি। সৌভাগ্যবশত, এই এলাকায় পর্যাপ্ত আবাসন রয়েছে।’ চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে মেডিকেল ভিসা প্রয়োজন। তবে বহির্বিভাগের (ওপিডি) রোগীদের জন্য মেডিকেল ভিসার প্রয়োজন হয় না। জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে অল্প সময়ের মধ্যেই মেডিকেল ভিসা দেয়া হয়। রূপক বড়ুয়া বলেন, ‘তবে ওপিডির চিকিৎসা নেয়া রোগীদের অনেকের চিকিৎসা দীর্ঘ সময় ধরে চলে। এ সময় তাদের হোটেলে থাকতে হয়। অনেকেই চিকিৎসার পাশাপাশি ভ্রমণও করেন।’
বিদেশি রোগীদের জন্য ‘যথাযথ আবাসনের’ ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে ডিসান হাসপাতালের আন্তর্জাতিক সেলও। হাসপাতালটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সজল দত্ত বলেন, ‘বাংলাদেশের এই পরামর্শের মূল লক্ষ্য হলো রোগী ও ভ্রমণকারীদের আগেই থাকার ব্যবস্থা করার এবং গন্তব্যের কাছাকাছি নিরাপদ ও চালু আছে এমন হোটেল বেছে নেয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা সতর্কতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৃত চিকিৎসা নিতে কলকাতায় আসা রোগীদের ক্ষেত্রে এর বড় কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি না।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিটি রোগী যাতে কলকাতায় আসা থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত নিরাপদ, সুবিধাজনক ও নির্বিঘ্ন অভিজ্ঞতা পান, সেটিই আমাদের লক্ষ্য। নিরাপত্তাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। রোগীদের চিকিৎসাসেবার প্রতিটি ধাপে তাদের পাশে থাকার বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

ডেস্ক রিপোর্ট 






















