নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে গত ১৮ আগস্ট ২০২৬ যাত্রা শুরু করে ‘পিংক বাস সার্ভিস’। সড়কমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে চালু হওয়া এই বিশেষ পরিবহন সেবার উদ্দেশ্য ছিল নারীদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াত নিশ্চিত করা। তবে চালুর পরপরই সেবাটির বাসের বহর নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। কারণ, নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য নামানো ‘পিংক বাস সার্ভিস’-এর কয়েকটি বাসেরই নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে চালু করা এই বিশেষ সেবার বহরেই রয়েছে আয়ুষ্কাল পেরোনো বাস।
বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, ‘নারায়ণগঞ্জ-ব-১১-০০৮৪’ নম্বরের কোরিয়ান একতলা বাসটি তৈরি হয় ২০১০-১১ সালে। বিআরটিএ ২০১১ সালের ২০ নভেম্বর বাসটির ফিটনেস সনদ দেয়। আর আমদানি চুক্তি অনুযায়ী এটির আয়ুষ্কাল ছিল ১৫ বছর। আয়ুষ্কাল শেষ হলেও নতুন রঙ ও মোড়ক দিয়ে বাসটি ‘পিংক বাস সার্ভিস’-এর বহরে নামানো হয়েছে।
স্টার নিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চমকে ওঠার মতো তথ্য। নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য যে বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে, সেই বহরের প্রায় অর্ধেক বাসেরই নির্ধারিত আয়ুষ্কাল শেষ। বিআরটিসির নথি অনুযায়ী, ১৪টি পিংক বাসের মধ্যে ৬টিরই ১২ বছরের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। আর বাকি ৮টি বাসেরও আয়ুষ্কাল শেষ হতে খুব বেশি সময় নেই— সেগুলোর মেয়াদ বাকি মাত্র ৫ বছর।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান স্টার নিউজকে বলেন, ‘গণপরিবহন হবে পরিবহনব্যবস্থার মেরুদণ্ড। এটিকে দুর্বল রাখার কোনো সুযোগ নেই। বাসের ফিটনেসের পাশাপাশি আয়ুষ্কালও নিশ্চিত করতে হবে। আয়ুষ্কালের বিষয়ে কঠোর থাকতে হবে। তাড়াহুড়ো করে আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া বাস নামানোর যে অভিযোগ উঠেছে, তাতে এই উদ্যোগটি শুরুতেই হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পিতভাবে বাসের সংখ্যা নির্ধারণ করে সেবা চালু করলে এটি আরও টেকসই হতে পারত।’
একদিকে আয়ুষ্কাল পেরোনো বাস নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে লোকসানেও চলছে সেবাটি। নথি ঘেঁটে দেখা যায়, গত ২৭ ও ৩০ আগস্ট দেশের ১০টি ডিপো থেকে ১৪টি পিংক বাস মিলে ট্রিপ দিয়েছে মাত্র ৩০টি। এই দিনে ১ হাজার ৭৯২টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ২৭ হাজার ৪২ টাকা। বিপরীতে জ্বালানি, টোল, বেতনসহ অন্যান্য খাতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯ টাকা। অর্থাৎ দুই দিনে লোকসান হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬১ হাজার টাকা।
এসব বিষয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান। তবে মুঠোফোনে আয়ুষ্কাল পেরোনো বাস চলার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই বাসগুলো চালু করা হয়েছে।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা স্টার নিউজকে ফোন কলের মাধ্যমে বলেন, ‘বাংলাদেশে যত গাড়ি আছে, সর্বোচ্চ সংখ্যকই আয়ুষ্কালের বাইরে। শুধু আমার গাড়ি নয়, অনেক গাড়িই এমন অবস্থায় আছে। আপনি যদি আট বছর আয়ুষ্কাল ধরেন, তাহলে প্রায় সব বাসই আট বছরের বেশি পুরোনো। কারণ ২০১৮-১৯ সালের পর আমাদের বহরে নতুন কোনো গাড়ি আসেনি। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ মহল জানে। প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই আপাতত বাসগুলো চালু করেছি। বৈদ্যুতিক বাস এলে এগুলো প্রতিস্থাপন করা হবে।’
দৈনিক লোকসানের বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান বলেন, সেবাটিকে লাভজনক করার চেষ্টা চলছে। সেই চেষ্টা সফল না হলে সরকারের কাছে আবারও অর্থ চাওয়া হবে।
আব্দুল লতিফ মোল্লা আরও বলেন, ‘এটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ, তাই আমাদের তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারের কিছু এজেন্ডাও আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব। সরকার নির্দেশনা দিলে আমরা টাকার কথা চিন্তা করতে পারি না। তবে সেবাটিকে লাভজনক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে সরকারের কাছে আবারও অর্থ চাইব।’
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেবাটি কার্যকর ও টেকসই করতে সরকারি বাসের পাশাপাশি বেসরকারি বাসকেও যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বাড়াতে হবে বাসের সংখ্যা, যাতে চাহিদার তুলনায় যাত্রীদের পরিবহন সুবিধা আরও নিশ্চিত করা যায়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান আরও জানান, ‘সরকার কোনো উদ্যোগ নিলে সেটি রোল মডেল হতে হবে, যাতে বেসরকারি খাতও সেখান থেকে শিখতে পারে। সেই বিবেচনায় আয়ুষ্কাল পেরোনো বাস দিয়ে এই সেবার যাত্রা শুরু করা উচিত হয়নি। আমাদের পাইপলাইনে বৈদ্যুতিক বাসের প্রস্তাবও রয়েছে। সেগুলো দিয়ে যাত্রা শুরু করা হলে এমন অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকত না।’
১৯৮০ থেকে ২০২৬—চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে বিআরটিসি। কখনও আলাদা বাস নামানো হয়েছে, কখনও বাড়ানো হয়েছে রুট। কিন্তু কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত টেকসই হয়নি। কিছুদিন চলার পরই থেমে গেছে সেবা, থেকে গেছে শুধু নতুন করে উদ্যোগ নেয়ার গল্প।
পর্যাপ্ত সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই তড়িঘড়ি করে চালুর অভিযোগে শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে পিংক বাস সার্ভিস। লোকসানের বোঝা কমিয়ে সেবাটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে আগে সরাতে হবে আয়ুষ্কাল পেরোনো বাস। পাশাপাশি প্রয়োজন রুটের পুনর্বিন্যাস। তা না হলে নারীদের জন্য নেয়া এই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত বিআরটিসির আরেকটি লোকসানি সেবায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















