ঢাকা , শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করেছিলেন মির্জা ফখরুল আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই: বিদ্যুৎমন্ত্রী জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি বলে বিদায়ের ইঙ্গিত ছাত্রদল সভাপতির আল্লামা সাঈদী আমাদের মাঝে নেই, রয়ে গেছে তার কণ্ঠের স্মৃতি ও কাজ: জামায়াত আমির বিদ্যুতের এত খারাপ অবস্থা ১০-১২ বছরেও দেখি নাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধে ইরান, কোন পথে ট্রাম্প রাজধানীতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের ৫৩ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার ‘অনুমতি ছাড়া হরমুজে জাহাজ চলবে না’, মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান ইরানের তারেক রহমানের প্রতি আমার পারিবারিক ও রাজনৈতিক টান রয়েছে: অলি ছাত্রদল নেতাকে থাপ্পড় মারা সেই ইউএনওকে প্রত্যাহার

বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করেছিলেন মির্জা ফখরুল

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০২:০২:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও দলীয় সংকট মোকাবিলা করে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে গেলেন বিএনপির শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সরকারের মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি।

 

 

 

বিএনপির একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দলের শীর্ষ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপরই তিনি সরকার ও দলের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী।

 

 

 

দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার কারণেই মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন।

 

 

নির্বাচন কমিশনের তপশিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে।

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য অভিষেকের পেছনে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। দলীয় নেতৃত্বের দুঃসময়ে দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

 

ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন একাধিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক পথচলার শুরু। ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলে।

 

 

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে এসে ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করার পর তিনি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

 

 

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে আসেন। কৃষি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পর তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

 

 

সরকারে থাকার সময় নীতিনির্ধারণে সক্রিয় একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি পেলেও ২০০৯ সালের পর তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয়।

 

 

বিএনপির কাউন্সিলে তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন এবং খালেদা জিয়ার কারাবাসের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির রাজপথের আন্দোলনে অন্যতম প্রধান নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন তিনি।

 

 

দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন, গ্রেপ্তার, মামলা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির প্রকাশ্য নেতৃত্বের সামনের সারিতে ছিলেন মির্জা ফখরুল। বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ ও আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে তাকে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কথা দলটির নেতারা বারবার তুলে ধরেছেন।

 

 

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য তার সংযত বক্তব্য ও পরিমিত রাজনৈতিক ভাষা। রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও ব্যক্তিগত আচরণ ও শালীনতার কারণে বিভিন্ন মহলে তার গ্রহণযোগ্যতার কথাও আলোচিত হয়ে থাকে।

 

 

বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার পেছনে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া তৃণমূলে বিএনপির নেতাকর্মীরাও মির্জা ফখরুলের ওপর আস্থা রাখেন।

 

 

বিএনপির রাজনৈতিক আন্দোলনের দীর্ঘ সময়ের তিনটি বড় প্রত্যাশার সঙ্গেও মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার প্রত্যাশা তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। দলের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তার নাম সামনে আসাকে তাই বিএনপির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি পরিণতি হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 

তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা। রাষ্ট্রের যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে রাজনৈতিক ভারসাম্য, সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় ঐক্যের ভূমিকা প্রত্যাশিত হয়। মির্জা ফখরুল সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন বলেই বিএনপির সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।

 

 

ঠাকুরগাঁওয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক যাত্রা দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। ছাত্ররাজনীতি থেকে স্থানীয় সরকার, সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তার নাম সামনে এসেছে।

 

 

তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরই নির্বাচনের পরবর্তী ধাপ স্পষ্ট হবে। বিএনপির মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ায় রাজনৈতিক সমীকরণে অবশ্য মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিত্ব এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়।

 

 

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুলের এই সম্ভাব্য যাত্রা শুধু একজন রাজনীতিকের পদোন্নতির ঘটনা নয়, বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করেছিলেন মির্জা ফখরুল

বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করেছিলেন মির্জা ফখরুল

আপডেট সময় ০২:০২:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও দলীয় সংকট মোকাবিলা করে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে গেলেন বিএনপির শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সরকারের মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি।

 

 

 

বিএনপির একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দলের শীর্ষ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপরই তিনি সরকার ও দলের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী।

 

 

 

দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার কারণেই মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন।

 

 

নির্বাচন কমিশনের তপশিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে।

 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য অভিষেকের পেছনে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। দলীয় নেতৃত্বের দুঃসময়ে দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

 

ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন একাধিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক পথচলার শুরু। ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলে।

 

 

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে এসে ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করার পর তিনি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

 

 

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে আসেন। কৃষি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পর তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

 

 

সরকারে থাকার সময় নীতিনির্ধারণে সক্রিয় একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি পেলেও ২০০৯ সালের পর তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয়।

 

 

বিএনপির কাউন্সিলে তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন এবং খালেদা জিয়ার কারাবাসের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির রাজপথের আন্দোলনে অন্যতম প্রধান নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন তিনি।

 

 

দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন, গ্রেপ্তার, মামলা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির প্রকাশ্য নেতৃত্বের সামনের সারিতে ছিলেন মির্জা ফখরুল। বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ ও আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে তাকে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কথা দলটির নেতারা বারবার তুলে ধরেছেন।

 

 

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য তার সংযত বক্তব্য ও পরিমিত রাজনৈতিক ভাষা। রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও ব্যক্তিগত আচরণ ও শালীনতার কারণে বিভিন্ন মহলে তার গ্রহণযোগ্যতার কথাও আলোচিত হয়ে থাকে।

 

 

বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার পেছনে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া তৃণমূলে বিএনপির নেতাকর্মীরাও মির্জা ফখরুলের ওপর আস্থা রাখেন।

 

 

বিএনপির রাজনৈতিক আন্দোলনের দীর্ঘ সময়ের তিনটি বড় প্রত্যাশার সঙ্গেও মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার প্রত্যাশা তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। দলের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তার নাম সামনে আসাকে তাই বিএনপির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি পরিণতি হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 

তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা। রাষ্ট্রের যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে রাজনৈতিক ভারসাম্য, সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় ঐক্যের ভূমিকা প্রত্যাশিত হয়। মির্জা ফখরুল সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন বলেই বিএনপির সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।

 

 

ঠাকুরগাঁওয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক যাত্রা দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। ছাত্ররাজনীতি থেকে স্থানীয় সরকার, সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তার নাম সামনে এসেছে।

 

 

তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরই নির্বাচনের পরবর্তী ধাপ স্পষ্ট হবে। বিএনপির মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ায় রাজনৈতিক সমীকরণে অবশ্য মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিত্ব এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়।

 

 

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুলের এই সম্ভাব্য যাত্রা শুধু একজন রাজনীতিকের পদোন্নতির ঘটনা নয়, বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠছে।