ঢাকা , সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
হাসিনা অসুস্থতার কারণে তাকে সংবাদ সম্মেলন দেখা যায় না: আসিফ নজরুল পশ্চিমবঙ্গে ২৫২ টি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ ডাকসুর সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি সরাতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে ছাত্রদল আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আ.লীগ ব্যবসায়ী ও এমপিদের প্রটেকশন দিয়েছে: রাশেদ খাঁন এআই না জানলে মুসলিমরা পিছিয়ে পড়বে: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি: স্পিকার নতুন পোশাক আইন করছে ভারত, বিপাকে মুসলিমরা ক্ষমতায় না যেতেই মজলুম থেকে জালিমে পরিণত হয়েছে জামায়াত: রাশেদ খাঁন জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শিবির নিয়ন্ত্রিত ডাকসু ‘পাকিস্তান প্রেম’ জাহির করছে: ছাত্রদল

জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখা মিলল ৪০০ বছরের পুরোনো মসজিদ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৩:২৫:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫৮ বার পড়া হয়েছে

এবার নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বৃচাপিলা শাহী জামে মসজিদ কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের কাছেগায়েবি মসজিদনামে পরিচিত এই প্রাচীন স্থাপনাটিতে এখনো মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর ছাপ স্পষ্ট। তিনটি বড় গম্বুজ, পুরু দেয়াল, নকশাখচিত প্রবেশদ্বার ও পুরোনো মেহরাবের কারুকাজ মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।

চাপিলা ইউনিয়নের বৃচাপিলা গ্রামে অবস্থিত মসজিদটি নাটোর জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে। স্থানীয় ইতিহাস ও উপজেলা প্রশাসনের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে তার ছেলে শাহ সুজা বাংলার সুবাদার থাকাকালে চাপিলা অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে মুঘল সেনাদের একটি ফাঁড়িও ছিল বলে জানা যায়। সেনাসদস্য, কর্মকর্তাকর্মচারী ও স্থানীয় মুসলমানদের নামাজের সুবিধার জন্যই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।

মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মুনশি এনায়েতউল্লাহর নাম পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে তাকে মুঘল প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গুরুদাসপুর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬২৮ থেকে ১৬৫৮ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। একসময় চাপিলা এলাকার গুরুত্ব কমে গেলে মুঘল সেনা ও অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে যান। ধীরে ধীরে কমতে থাকে জনবসতি। একপর্যায়ে ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে ঢেকে যায় মসজিদটি। দীর্ঘদিন মানুষের দৃষ্টির আড়ালে পড়ে থাকে প্রাচীন এই স্থাপনা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে নতুন করে সেখানে বসতি গড়তে শুরু করেন। সে সময় জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা মসজিদটির সন্ধান পান। পরে স্থানীয় উদ্যোগে মসজিদটি পরিষ্কার ও সংস্কার করা হয় এবং সেখানে আবার নামাজ আদায় শুরু হয়। জঙ্গলের ভেতর থেকে হঠাৎ মসজিদটি খুঁজে পাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় নানা লোককথার জন্ম নেয়। অনেকের মধ্যে ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, মসজিদটি নাকি অলৌকিকভাবে এক রাতেই তৈরি হয়েছিল। সেখান থেকেই মানুষের মুখে মুখে এর নাম হয়ে যায়গায়েবি মসজিদ তবে মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক উপাদানগুলো মুঘল আমলের নির্মাণশৈলীর সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইট ও সুড়কি দিয়ে নির্মিত মূল মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ২০ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় চার ফুট। পুরোনো স্থাপনায় রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ এবং দুই পাশে দুটি মিনার। গম্বুজ ও মিনারের চূড়ায় রয়েছে চাঁদতারার প্রতীক। সংস্কারের পর গম্বুজে সোনালি রং করা হয়েছে।

মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে কারুকাজ করা তিনটি দরজা। ভেতরের দেয়াল ও মেহরাবেও পুরোনো অলংকরণের চিহ্ন রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতি ও বিভিন্ন সময়ে সংস্কারকাজের কারণে প্রাচীন কারুকাজের কিছু অংশ হারিয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, একসময় পুরো এলাকা বড় বড় বেতঝোপ ও জঙ্গলে আচ্ছাদিত ছিল। পুরোনো প্রজন্মের কাছ থেকে তাঁরা শুনেছেন, সেই জঙ্গলের মধ্যেই মসজিদটি চাপা পড়ে ছিল। আশপাশের পরিবেশ এতটাই জঙ্গলাকীর্ণ ছিল যে বন্য প্রাণীর আতঙ্কও ছিল। মুসল্লিদের কেউ কেউ পালা করে পাহারা দিয়ে নামাজ আদায় করতেন বলে জানান স্থানীয় প্রবীণরা। মসজিদের খতিব মাওলানা মাহমুদুল্লাহ জানান, পুরোনো মসজিদে তিন কাতারে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ জন মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। পরে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯৯০ সালের পর মসজিদের পরিসর বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রতি ওয়াক্তে অর্ধশতাধিক মানুষ নামাজ আদায় করেন। আর জুমার দিনে মুসল্লির সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, মসজিদের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিও রয়েছে। পুরোনো রেকর্ডে মুনশি এনায়েতউল্লাহর পক্ষ থেকে মসজিদের জন্য জমি দানের তথ্য পাওয়া যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বর্তমানে মসজিদটি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং গুরুদাসপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ প্রাচীন এই স্থাপত্য দেখতে আসেন। প্রায় চার শতাব্দী ধরে রোদবৃষ্টি, ঝড় ও সময়ের ক্ষয় সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা বৃচাপিলা শাহী জামে মসজিদ আজও যেন হারিয়ে যাওয়া একটি জনপদ এবং মুঘল আমলের ইতিহাসের গল্প বলে চলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পুরোনো স্থাপত্যের স্মৃতি ধরে রাখা এই মসজিদ তাই নাটোরের ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসিনা অসুস্থতার কারণে তাকে সংবাদ সম্মেলন দেখা যায় না: আসিফ নজরুল

জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখা মিলল ৪০০ বছরের পুরোনো মসজিদ

আপডেট সময় ০৩:২৫:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

এবার নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বৃচাপিলা শাহী জামে মসজিদ কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের কাছেগায়েবি মসজিদনামে পরিচিত এই প্রাচীন স্থাপনাটিতে এখনো মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর ছাপ স্পষ্ট। তিনটি বড় গম্বুজ, পুরু দেয়াল, নকশাখচিত প্রবেশদ্বার ও পুরোনো মেহরাবের কারুকাজ মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।

চাপিলা ইউনিয়নের বৃচাপিলা গ্রামে অবস্থিত মসজিদটি নাটোর জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে। স্থানীয় ইতিহাস ও উপজেলা প্রশাসনের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে তার ছেলে শাহ সুজা বাংলার সুবাদার থাকাকালে চাপিলা অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে মুঘল সেনাদের একটি ফাঁড়িও ছিল বলে জানা যায়। সেনাসদস্য, কর্মকর্তাকর্মচারী ও স্থানীয় মুসলমানদের নামাজের সুবিধার জন্যই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।

মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মুনশি এনায়েতউল্লাহর নাম পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে তাকে মুঘল প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গুরুদাসপুর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬২৮ থেকে ১৬৫৮ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। একসময় চাপিলা এলাকার গুরুত্ব কমে গেলে মুঘল সেনা ও অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে যান। ধীরে ধীরে কমতে থাকে জনবসতি। একপর্যায়ে ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে ঢেকে যায় মসজিদটি। দীর্ঘদিন মানুষের দৃষ্টির আড়ালে পড়ে থাকে প্রাচীন এই স্থাপনা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে নতুন করে সেখানে বসতি গড়তে শুরু করেন। সে সময় জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা মসজিদটির সন্ধান পান। পরে স্থানীয় উদ্যোগে মসজিদটি পরিষ্কার ও সংস্কার করা হয় এবং সেখানে আবার নামাজ আদায় শুরু হয়। জঙ্গলের ভেতর থেকে হঠাৎ মসজিদটি খুঁজে পাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় নানা লোককথার জন্ম নেয়। অনেকের মধ্যে ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, মসজিদটি নাকি অলৌকিকভাবে এক রাতেই তৈরি হয়েছিল। সেখান থেকেই মানুষের মুখে মুখে এর নাম হয়ে যায়গায়েবি মসজিদ তবে মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক উপাদানগুলো মুঘল আমলের নির্মাণশৈলীর সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইট ও সুড়কি দিয়ে নির্মিত মূল মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ২০ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় চার ফুট। পুরোনো স্থাপনায় রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ এবং দুই পাশে দুটি মিনার। গম্বুজ ও মিনারের চূড়ায় রয়েছে চাঁদতারার প্রতীক। সংস্কারের পর গম্বুজে সোনালি রং করা হয়েছে।

মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে কারুকাজ করা তিনটি দরজা। ভেতরের দেয়াল ও মেহরাবেও পুরোনো অলংকরণের চিহ্ন রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতি ও বিভিন্ন সময়ে সংস্কারকাজের কারণে প্রাচীন কারুকাজের কিছু অংশ হারিয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, একসময় পুরো এলাকা বড় বড় বেতঝোপ ও জঙ্গলে আচ্ছাদিত ছিল। পুরোনো প্রজন্মের কাছ থেকে তাঁরা শুনেছেন, সেই জঙ্গলের মধ্যেই মসজিদটি চাপা পড়ে ছিল। আশপাশের পরিবেশ এতটাই জঙ্গলাকীর্ণ ছিল যে বন্য প্রাণীর আতঙ্কও ছিল। মুসল্লিদের কেউ কেউ পালা করে পাহারা দিয়ে নামাজ আদায় করতেন বলে জানান স্থানীয় প্রবীণরা। মসজিদের খতিব মাওলানা মাহমুদুল্লাহ জানান, পুরোনো মসজিদে তিন কাতারে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ জন মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। পরে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯৯০ সালের পর মসজিদের পরিসর বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রতি ওয়াক্তে অর্ধশতাধিক মানুষ নামাজ আদায় করেন। আর জুমার দিনে মুসল্লির সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, মসজিদের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিও রয়েছে। পুরোনো রেকর্ডে মুনশি এনায়েতউল্লাহর পক্ষ থেকে মসজিদের জন্য জমি দানের তথ্য পাওয়া যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বর্তমানে মসজিদটি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং গুরুদাসপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ প্রাচীন এই স্থাপত্য দেখতে আসেন। প্রায় চার শতাব্দী ধরে রোদবৃষ্টি, ঝড় ও সময়ের ক্ষয় সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা বৃচাপিলা শাহী জামে মসজিদ আজও যেন হারিয়ে যাওয়া একটি জনপদ এবং মুঘল আমলের ইতিহাসের গল্প বলে চলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পুরোনো স্থাপত্যের স্মৃতি ধরে রাখা এই মসজিদ তাই নাটোরের ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।