এবার অভিন্ন সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত যৌথ সীমান্ত কমিশন চালু করেছে পাকিস্তান ও চীন। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ইসলামাবাদে কমিশনের প্রথম বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথ জরিপ, বাণিজ্য ও দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ বাড়াতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান। তবে শুরুতেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এর বিরোধিতা করেছে ভারত। নয়াদিল্লির দাবি, এই কমিশনের কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান ও চীনের এ ধরনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়। সংবাদমাধ্যম দ্য ডন বলছে, বুধবার ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যৌথ সীমান্ত কমিশনের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে। বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত ও সমুদ্রবিষয়ক বিভাগের উপমহাপরিচালক লি ইয়া এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের চীনবিষয়ক মহাপরিচালক বিলাল মাহমুদ চৌধুরী।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর পাকিস্তান–চীন যৌথ সীমান্ত কমিশন চালুর ঘটনাকে ‘পাকিস্তান–চীন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের ভাষ্য, এর মাধ্যমে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথভাবে সীমান্ত জরিপ, বাণিজ্য চলাচল এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে। দ্য ডন বলছে, এই কমিশনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা–সংক্রান্ত চুক্তিতে। তৎকালীন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেছিয়াংয়ের ইসলামাবাদ সফরের সময় চুক্তিটি সই হয়। চুক্তির ৪৫ নম্বর অনুচ্ছেদে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি যৌথ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্তের বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা সমাধানে দুই দেশ একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পাবে। এর আওতায় সীমান্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিদর্শন, যৌথ জরিপ, সীমান্ত চিহ্ন নিয়ে সমস্যা, সীমান্ত পারাপারের বিভিন্ন স্থাপনা ও সুবিধা ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্তসংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনার মোকাবিলার মতো বিষয় থাকবে।
কমিশন চালুর ফলে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে নিয়মিত সমন্বয়েরও সুযোগ তৈরি হবে। দুই দেশের মানুষের যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খুনজেরাব সীমান্তপথ এবং চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও এর আওতায় রয়েছে। নতুন এই কমিশন ১৯৬৩ সালের ২ মার্চ স্বাক্ষরিত চীন–পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তির আওতায় গঠিত যৌথ সীমান্ত নির্ধারণ কমিশন থেকে আলাদা। আগের কমিশনের দায়িত্ব ছিল নির্দিষ্ট ও মূলত এককালীন। এর মাধ্যমে সীমান্ত জরিপ করা, সীমান্তের চিহ্ন স্থাপন, বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি এবং সীমান্তরেখা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সীমান্ত নির্ধারণের কাজ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রটোকল ও মানচিত্রে স্বাক্ষরের মাধ্যমে ওই কমিশনের কাজ শেষ হয়। ১৯৬৩ সালের চুক্তিটি বেইজিংয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চেন ই। ওই চুক্তিতে আরও বলা হয়েছিল, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে কাশ্মীর বিরোধের সমাধান হলে সংশ্লিষ্ট সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ চীনের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে আবার আলোচনা করবে।
অন্যদিকে ২০১৩ সালের চুক্তির মাধ্যমে ইতোমধ্যে নির্ধারিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। এতে সীমান্তের চিহ্ন এবং সীমান্তবর্তী অবকাঠামো নিয়ে বিভিন্ন বিষয় মোকাবিলার বিধান রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো সীমান্তচিহ্ন তার আগের জায়গায় পুনঃস্থাপন করা সম্ভব না হলে যৌথ কমিশন সেটির জন্য অন্য উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করতে পারবে। তবে এতে সীমান্তরেখার কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। তবে চীন–পাকিস্তানের নতুন এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে ভারত। ১৯৬৩ সালের চুক্তির বৈধতা নিয়েও ভারতের আপত্তি রয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় থাকা অঞ্চলকে ভারত জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের অংশ হিসেবে দাবি করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট ও ধারাবাহিক। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। আমরা তথাকথিত যৌথ কমিশন প্রত্যাখ্যান করছি, কারণ এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’
সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ১৯৪৭–৪৮ সালের যুদ্ধের পর থেকে পাকিস্তান তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের কিছু এলাকা দখল করে রেখেছে। একই সঙ্গে আকসাই চিন ও শাকসগাম উপত্যকার মতো অঞ্চল পাকিস্তান অবৈধভাবে চীনের কাছে হস্তান্তর করেছে বলেও অভিযোগ করে আসছে নয়াদিল্লি। চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরেরও বিরোধিতা করে ভারত। কারণ, এর একটি অংশ পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে গেছে বলে ভারতের দাবি। রণধীর জয়সওয়াল আরও বলেন, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের পুরো অঞ্চল ‘ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ ছিল, আছে এবং সবসময় থাকবে’। তার ভাষ্য, ‘অবৈধ ও জোরপূর্বক দখলে থাকা ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার পাকিস্তানের নেই’।
তিনি বলেন, ভারত কখনোই ১৯৬৩ সালের তথাকথিত ‘চীন–পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি’ স্বীকৃতি দেয়নি এবং বরাবরই এটিকে ‘অবৈধ ও অকার্যকর’ বলে আসছে। ওই চুক্তির মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরের কিছু অংশ চীনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। জয়সওয়াল বলেন, ‘দখলকৃত এসব অঞ্চলের অবস্থান পরিবর্তন বা অবৈধ দখলকে বৈধতা দেয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার আমরা দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা ও প্রত্যাখ্যান করি। এসব পদক্ষেপ ভারতের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর প্রভাব ফেলে।’ চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে যেকোনো ‘তথাকথিত সীমান্ত সহযোগিতা’ ভারতের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ ওই অঞ্চলগুলোর ওপর ভারতের সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে ‘কোনো প্রভাব ফেলবে না’।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















