এবার চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার সাতগড় গ্রামের শিশু মো. রায়হানের একটি পা ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রাজধানীর একটি চক্র কেটে দিয়েছে সম্প্রতি এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। মূলত ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে রায়হানের একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার পরিচর্যার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে একজন আয়াকেও প্রায় দেড় মাস দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর উদ্দেশ্যে কেউ তার পা কেটে দিয়েছে এমন তথ্যের সঙ্গে পাওয়া ঘটনার মিল নেই।
এ বিষয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় রাজধানীর ঢাকা রেলওয়ে থানার পুলিশের এক কর্মকর্তার। তিনি ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিস্তারিত তুলে ধরেন। তবে পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা। তার বক্তব্যের তথ্য প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, রায়হান কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আসার পর আল আমিন নামে এক যুবকের সঙ্গে লভ্যাংশের বিনিময়ে পানি বিক্রি করত। পাশাপাশি সে ভিক্ষাবৃত্তিও করত। চলতি বছরের ১১ জুন ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে গোসল করে কমলাপুরে ফেরার পথে ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হয় রায়হান। ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার পর পুলিশ রায়হানকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ জুলাই রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে তার একটি পা কেটে ফেলা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তাকে আইসিইউতেও রাখা হয়েছিল। পরে মাথায় আঘাতের চিকিৎসার জন্য তাকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, অস্ত্রোপচারের পর রায়হানকে প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। এ সময় সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে তার পরিচর্যার জন্য একজন আয়াকে দেওয়া হয়। আরেছা নামের ওই আয়াই প্রায় দেড় মাস রায়হানের দেখাশোনা করেন। পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে রায়হান কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের জরিনা নামের এক নারীর কাছে আশ্রয় নেয়। সেখানে সবাই জরিনাকে ‘মালির মা’ নামে চিনতেন। এরপর রায়হান স্টেশনে ভিক্ষা করত এবং জরিনার কাছেই থাকত।
পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে রায়হান তাদের জানায়, তার মা মারা গেছেন। তাই সে বাড়িতে যেতে চায়। পরে রায়হানের বন্ধু জাকির তাকে যাত্রাবাড়ীতে নিয়ে যায় এবং একটি বাসে তুলে দেয়। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, রায়হানকে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে রিয়াজুল করিম নামে রেলওয়ে পুলিশের একজন কনস্টেবলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া রেলওয়ে স্টেশনের মিনা নামের এক নারীও রায়হানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এরপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মিনাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করছেন। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।
এদিকে ট্রেন দুর্ঘটনায় রায়হান আহত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে হাসপাতালের মেঝেতে বসে রায়হানকে বলতে শোনা যায়, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে সে আহত হয়েছে। একই সময়ে সে জানায়, তার মা–বাবা নেই। ভিডিওতে তার মাথা ও পেটে আঘাতের চিহ্নও দেখা যায়। রায়হান চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার নাজিম উদ্দীনের ছেলে। ১২ বছর বয়সী রায়হান একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করত। প্রায় সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে চুনতি এলাকার ওই মাহফিলে শিশুটিকে দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তার পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে শিশুটিকে শনাক্ত করেন তার বাবা। শিশুটির বাবা পেশায় দিনমজুর। শিশুটির মায়ের সঙ্গে বাবার বিচ্ছেদ হয়েছে। বর্তমানে মা–বাবার আলাদা সংসার রয়েছে। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগে শিশুটি তার সৎমায়ের সঙ্গে থাকত। তখন তার ডান পা ছিল না। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের চিহ্ন দেখা যায়। এরপরই তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করতে রাজধানীর একটি চক্র পা কেটে দিয়েছে এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে জানতে রায়হান ও তার পবিরারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবেদক। তারা ওই প্রতিবেদকের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি। তারা এখন হাসপাতালে আছে বলেও নিশ্চিত করেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























