পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয় পেতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ইশতেহার ছিল ক্ষমতায় এলে সীমান্তে অরক্ষিত স্থানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হবে। সরকার গঠনের প্রথম মাসেই বিএসএফের হাতে অধিগ্রহণ করা ১২০ একর জমি হস্তান্তর করে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার। কয়েক ধাপে মোট ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে।
বিজেপি সরকারের দাবি, ইতোমধ্যেই ১০০ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে। বাকি এলাকাতেও কাঁটাতারের বেড়া দিতে চলছে জমি অধিগ্রহণের তোড়জোর। এমন অবস্থায় মুর্শিদাবাদ জেলায় জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে স্থানীয় কৃষকদের বাধা সম্মুখীন হয়েছে বিএসএফ। এমন দাবি করেছে দেশটির মানবাধিকার সংগঠন গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এপিডিআর)।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) মুর্শিদাবাদের জেলা প্রশাসককে উদ্দেশ্যে এপিডিআরের লেখা চিঠিতে এই দাবি করা হয়েছে।
চিঠিতে মুর্শিদাবাদের জলঙ্গিতে কৃষকের অসম্মতিতে রাজ্য সরকার ও বিএসএফ দ্বারা কৃষিজমি অধিগ্রহণ করার বিরোধিতা করা হয়েছে। সন্দেহজনক অনুপ্রবেশকারী বলে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ বন্ধ করা ও মুর্শিদাবাদ জেলায় বেআইনিভাবে আটকের জন্য তৈরি ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটক শিবির বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে এপিডিআর।
এপিডিআর জানায়, গত ৩১ মে মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী এলাকা ডোমকল মহকুমার জলঙ্গি ব্লকে কৃষকদের রেকর্ডভুক্ত তিন ফসল চাষের জমি বিএসএফ লাল পতাকার সীমানা দিয়ে অধিগ্রহণ করতে যায়। এর বিরুদ্ধে স্থানীয় কৃষকরা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। প্রতিবাদে বিপুল সংখ্যক কৃষক ভুতগাড়ির মাঠসংলগ্ন হাইরোড অবরোধ করেন।
এ সময় জলঙ্গি থানার পুলিশ ও বিএসএফ একসঙ্গে এসে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে কৃষকদের সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডা বেঁধে যায়। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কৃষকদের চাষের জমি দখল না করার মৌখিক আশ্বাস দিলে কৃষকরা অবরোধ তুলে নেন।
এই ঘটনার তিন দিন পর এপিডিআর মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির ডোমকল শাখাসহ নয়জনের একটি দল তথ্য অনুসন্ধানে যায়। প্রথমে তারা ঘোষপাড়া সর্বপল্লী ভুতগাড়ির মাঠটি পর্যবেক্ষণ করে। এই মাঠটিতে প্রায় ১৫ হাজার বিঘা তিন ফসলি চাষের জমি রয়েছে।
দক্ষিণ ঘোষপাড়া, সর্বপল্লী, ফরাজীপাডা, মুরাদপুর এবং উত্তর ঘোষপাড়া গ্রামের কৃষকেরা এই জমির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই মাঠে মূলত পাট, গম, কলাই, মসুরি, রসুন, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ করা হয়। মাঠটি ঘুরে দেখার পর কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে এপিডিআর-এর প্রতিনিধি দলটি গ্রামগুলোতে যায়।
এপিডিআর প্রতিনিধিদল গ্রামে পৌঁছালে বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা এসে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। কৃষকেরা জানান, ভুতগাড়ির মাঠটি জলঙ্গি গ্রাম পঞ্চায়েতের বড়বিল রঘুনাথপুর ২৫ নম্বর সেক্টর মৌজার অধীনে।
মাঠে কৃষকদের প্রত্যেকের জমির পরিমাণ খুব বেশি নয়; কারও এক বিঘা, দেড় বিঘা বা দুই বিঘা। বাপ-দাদার আমল থেকে তারা এই জমিতে চাষাবাদ করে আসছেন। জলঙ্গির ব্যাপক নদীভাঙনে ইতোমধ্যে অনেক উর্বর জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে, ফলে অবশিষ্ট এই জমির ওপরই এখন এলাকার কৃষকদের বেঁচে থাকা নির্ভর করছে।
মাঠে যে কৃষকদের জমি আছে তা সবই সরকারি খাতায় নথিভুক্ত বা রেকর্ডভুক্ত। জমিটি যথেষ্ট উর্বর এবং এখানে সারা বছরই নানা ধরনের ফসল ফলে, যার মধ্যে বিশেষ করে পাট ও গম খুব ভালো চাষ হয়। এই জমির ওপর পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০টি পরিবার নির্ভরশীল। জমিটি চলে গেলে প্রায় ৩ হাজার মানুষ পুরোপুরি পথে বসবে। তাই কৃষকেরা এই জমি কোনোভাবেই হাতছাড়া বা বিক্রি করতে রাজি নন।
তাদের মতে, জমির তুলনায় ক্ষতিপূরণের সামান্য টাকা কিছুই নয়; জমি বছরের পর বছর ধরে তাদের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখছে, কিন্তু ক্ষতিপূরণের এই সামান্য টাকা গরিবের সংসারে টানাটানির কারণে কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।
এপিডিআর তাদের বয়ানে জানায়, চাষিরা চান বিএসএফ কৃষকদের চাষের জমি ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো জায়গায় নিজেদের ক্যাম্প তৈরি করুক। এসব জমিতে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে চাষাবাদ করেন। পাশের হিন্দু এলাকার কৃষকেরাও এই জমি কোনোভাবেই হাতছাড়া করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে এপিডিআর আরও জানায়, পাশের হিন্দু গ্রামের অনেকেই তাদের বলেছেন যে, বিগত সরকারের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তারা নতুন সরকার এনেছেন। কিন্তু নতুন সরকার আসার পরও বর্ডার এলাকার চাষিদের জমি বিএসএফকে দিয়ে দখল করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা তারা কিছুতেই মেনে নেবেন না।
বিএসএফ ও পুলিশ ক্রমশ এলাকার চাষিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তাই নিজেদের জমি রক্ষায় তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করবেন। কৃষকেরা আরও জানান, গত দু বছর আগে থেকেই বিএসএফের নজর এই জমির ওপর পড়েছিল। এই সময়ের মধ্যে তারা দুবার এসে জমিও মেপে গেছে। তবে সে সময় কৃষকদের তীব্র অসন্তোষের কারণে বিএসএফ আর জমি নিতে সাহস করেনি। এখন আবারও নতুন করে জমি নেওয়ার তৎপরতা শুরু হয়েছে।
এপিডিআর তাদের তথ্যানুসন্ধান টিমের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জেলা শাসককে দেওয়া চিঠিতে জানায়—
১. রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিজেপি পরিচালিত নতুন রাজ্য সরকার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে বিএসএফকে জমি দেওয়ার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। সেই বিজ্ঞপ্তির জের ধরেই এখন বিএসএফ কৃষকদের গ্রামের ভেতরের রেকর্ডভুক্ত চাষের জমি অধিগ্রহণ করতে উদ্যত হয়েছে।
২. কৃষকদের ইচ্ছা বা অসম্মতির বিরুদ্ধে গিয়ে বিএসএফের এভাবে চাষের জমি অধিগ্রহণ করার চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক।
৩. এই জমি দখল করতে গিয়ে যেভাবে বিএসএফ এবং পুলিশ যৌথভাবে প্রতিবাদী কৃষকদের মাঝে আতঙ্ক বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে, তা চরমতম অন্যায় ও বেআইনি। এর মাধ্যমে নিজেদের জমি রক্ষার পক্ষে কৃষকদের মত প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
৪. সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা কার্যত বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারির পাশাপাশি মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বর্ডারে হোল্ডিং সেন্টার বা ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে। এপিডিআরের তথ্যানুসন্ধান টিম মনে করে, এটি আসলে একটি ভয়ংকর জনবিরোধী পদক্ষেপ, যাতে করে চাষের জমি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে কৃষকেরা ‘বাংলাদেশি’ তকমার ভয়ে মুখ খুলতে না পারেন।
মানবাধিকার সংগঠনটি তাদের পর্যবেক্ষণে আরও দাবি করে—
১. কৃষকদের অসম্মতি থাকলে কোনোভাবেই জলঙ্গীর সর্বপল্লী ভূতগাড়ির মাঠের তিন ফসলি চাষের জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।
২. সংবাদমাধ্যমের সূত্র ধরে জানা গেছে যে, মুর্শিদাবাদ থেকে কথিত বাংলাদেশি সন্দেহে বেশ কিছু মানুষকে বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে। এই মানবতাবিরোধী, বেআইনি ও অসাংবিধানিক পুশব্যাক অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এখন পর্যন্ত ‘পুশব্যাক’ করা সমস্ত মানুষের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে এবং ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষের হেনস্তা বন্ধ করতে হবে। কেবলমাত্র আদালতে অপরাধ প্রমাণিত ও ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে সাব্যস্ত হলেই কাউকে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে সে দেশে পাঠানো যাবে।
৩. মুর্শিদাবাদে গড়ে তোলা সমস্ত হোল্ডিং সেন্টার বা আটক শিবির অবিলম্বে তুলে দিতে হবে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কেবল সন্দেহের বশে কাউকে দিনের পর দিন আটকে রাখা যায় না। হোল্ডিং সেন্টারে কথিত বাংলাদেশি সন্দেহে আটকে রাখা নাগরিকদের সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমকে দেখা করার অনুমতি দিতে হবে। সেই সঙ্গে, সেখানে রাখা নাগরিকদের সমস্ত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং তাদের মুক্তি দিতে হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















