বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘সারাদেশে এখন জনমনে আতঙ্ক যে, বাংলাদেশের মানুষের জননিরাপত্তা নেই। শিশুদের নিরাপত্তা নেই।’
শনিবার (১৯ জুলাই) রাতে রংপুর জেলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লং মার্চের সমাপনী সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সারাদেশে এখন জনমনে আতঙ্ক যে, বাংলাদেশের মানুষের জননিরাপত্তা নেই। শিশুদের নিরাপত্তা নেই।’ আমাদের মা-বোনদের নিরাপত্তা নেই। কেন এই নিরাপত্তা নেই? কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ হচ্ছেন? তিনি তার জবাবদিহিতা সংসদে দিচ্ছেন না।’
জবাবদিহি চাওয়া হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন’ এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, ‘গুম আইন’ করে গুমের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। বিরোধী দল দমনে পুলিশকে আবারও ব্যবহারের চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা আর কাউকেই স্বৈরাচারী হতে দেবে না।’ কেউ স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করলে রংপুরের মাটি থেকেই ‘প্রথম বিদ্রোহ, প্রথম বিপ্লবের আহ্বান’ আসবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
জুলাই গণহত্যার একটি মামলার রায় ঘোষণার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘রায় তাদের জন্যই আসে, মৃত্যুদণ্ড তাদের জন্যই আসে যারা দেশে নেই। যারা দেশে অবস্থান করছে, তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কেন আসে না? আমরা তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেখতে চাই। রায় কার্যকর দেখতে চাই।’
দেশজুড়ে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘সারা দেশে নজিরবিহীন দলীয়করণ হয়েছে। সকল প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করা হচ্ছে। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বসহ সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন এলাকা।’
তিনি বলেন, এসব পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে আমরা আট দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। ২০২৪ সালের মতো জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে আট দফা দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরবেন বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। রংপুরের কৃষিনির্ভর মানুষের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এই রংপুর অঞ্চলের মানুষ বেশিরভাগ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। আজকে তারা সার, গ্যাস, বিদ্যুৎ পাচ্ছে না।’
১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় জোটের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। সিরাজগঞ্জে একজন নেতাকর্মীকে হামলা করে আহত করার খবর পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
ঘটনাটি সত্য হলে রাজপথে এর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এগারো দলের জোটের নেতাকর্মীদের কারো গায়ে যদি হাত তোলা হয়, পাল্টা আঘাতের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। সরকারকেও প্রস্তুত থাকতে হবে।’
রংপুরবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘এই রংপুরবাসীকে এখন শুনতে হচ্ছে যে, বিরোধী দলে ভোট দেওয়ার কারণে রংপুরবাসী কোনো উন্নয়নের বরাদ্দ পাবে না।’
রংপুরের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও অবহেলা করা হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য তাদের আট দফার একটি দাবি বিশেষভাবে রাখা হয়েছে। সেটি হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। তিনি বলেন, ‘এটা শুধু কথার কথা নয়, এটা শুধু দাবির দাবি নয়। আমরা সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন দেখতে চাই। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না? কেন দিল্লির সঙ্গে তারা নেগোশিয়েট করতে পারছে না? কেন ভূ-রাজনীতিতে তারা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে পারছে না?’
তিনি বলেন, এসব ঘটনা থেকেই তারা মনে করেন, সরকার বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নয়, বরং নিজেদের দলীয় স্বার্থ আদায়ের জন্য ক্ষমতায় গেছে।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে এ লংমার্চের আয়োজন করে ১১-দলীয় ঐক্য। আয়োজকদের পক্ষ থেকে এটিকে জোটের দ্বিতীয় বড় লংমার্চ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়।
লংমার্চের বহর রংপুরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সকাল ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে সকাল ৮টার দিকে বহরটি রওনা হয়। পথে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস, টাঙ্গাইলের নগর জালপাই, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল, বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড় ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া কয়েকটি স্থানে অনানুষ্ঠানিকভাবে পথসভা শেষে সন্ধ্যায় রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও দলের আমির ডা শফিকুর রহমান, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য ওমর ফারুক, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম এবং ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সিবগাসহ ১১ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















