কোনো হারাম টাকায় বাজেট করলে সেখানে কোনো বরকত হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। মঙ্গলবার (১৯ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ও জাতীয় উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রাক–বাজেট সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। সংলাপে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, নৈতিক ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার, দলীয়করণের অবসান এবং সুদভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে জনকল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলেছেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষ ও নৈতিক মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে; একই সঙ্গে শিক্ষাখাতে বরাদ্দও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বাজেট আসে, বাজেট যায়। ১৯৮৪ সাল থেকে অনেক বাজেটে দেখেছি এবং অনেক বাজেটে না থেকে দেখেছি। সেসব বাজেটের মধ্যে চরিত্রগত কোনো পার্থক্য দেখিনি। একই পদ্ধতিতে চলে আসছে। গৎবাঁধা বাজেট, গরিব মারার বাজেট নামে স্লোগান আমরা দিয়েছি। কিন্তু বাজেটের কোনো পরিবর্তন হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘বাজেটের পরিবর্তন হতে পারে তখনই যদি আমরা যে টাকাগুলো উপার্জন করি সেগুলো হালাল হয়। কোনো হারাম টাকায় বাজেট করলে সেখানে কোনো বরকত হতে পারে না। সেজন্য আমাদের উপার্জন হতে হবে হালাল। ব্যক্তির উপার্জন যেমন হালাল হতে হবে, তেমনি জাতীয় উপার্জনও হতে হবে হালাল। হারাম দিয়ে জাতিকে কল্যাণকর কোনো কিছু দেওয়া যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজেট এলো, জিনিসপত্রের দাম আবার বাড়লো– জনগণের মধ্যে এমন আতঙ্ক তৈরি হয়। এমনি তেলের কারণে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বাজেট এলেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে জনগণ পেরেশান হয়ে যাচ্ছে। এজন্য কৃষকের বাজেট, শ্রমিকের বাজেট, শিক্ষকের বাজেটকে বিশ্লেষণ করে আমাদের দেখতে হবে জনগণের কল্যাণের জন্য কতটুকু কী করা যায়।’ সংলাপে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যে বিনাখরচে শিক্ষা পাওয়ার কথা বলা হয়, সেখানে কিছু অদৃশ্য খরচ রয়েছে। আমাদের বাচ্চাদের স্কুলের উপকরণগুলো সহজলভ্য না। শুধু বই ও স্কুলের বেতন ফ্রি করে দিলেই শিক্ষা ফ্রি হয় না। দ্বিতীয়ত; কর্মমুখী শিক্ষার যে কথা, সেখানে দুটি ধারা খুবই অনুপযোগী। শিক্ষার্থীরা ভোকেশনাল ও মূলধারা জেনে বড় হয়। আমাদের স্কুলগুলো সমন্বিত না কেন?’
তিনি বলেন, ‘এসএসসি পাস করার সময় আমাদের প্রত্যেক বাচ্চার একটি করে বৃত্তিমূলক শিক্ষা পাওয়া সম্ভব কি না, সম্ভব হলে এটাকে সমন্বিত করে দিচ্ছি না কেন? একটি স্কুল ও একটি ভোকেশনাল স্কুল একসঙ্গে কাজ করবে। প্রত্যেক বাচ্চা একটি বৃত্তিমূলক শিক্ষাসহ মূলধারায় শিক্ষিত হবে। এটা ছাড়া ভোকেশনালকে মূলধারায় আনতে পারছি না, আবার মূলধারার শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স পাসের পর সেখানে গিয়ে আবেদন করছে। এই দুর্বলতাগুলো দূর করা দরকার।’ অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রব বলেন, ‘বাংলাদেশে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা হয়। অথচ শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও অন্যান্য দেশে প্রায় ৫–৬ শতাংশ ব্যয় করা হয়। তাই আমরা কত পিছিয়ে আছি, সেটি উপলব্ধি করতে হবে এবং শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।’
তিনি উদাহরণ হিসেবে মাহাতির মুহাম্মদের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনি ক্ষমতায় এসে শিক্ষাখাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আমাদের দেশের যেসব ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার ও প্রফেসর বিদেশে অবস্থান করছেন, তাদের উপযুক্ত বেতন ও সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তারা দেশেই ফিরে আসবেন। বর্তমানে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে ১০–১২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নীতি–নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতি আজ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এই শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। গবেষণার অভাবও প্রকট। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন অত্যন্ত কম; বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ভারতে প্রায় দ্বিগুণ।’
খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, ‘সব শিক্ষাব্যবস্থার মূল হলো নৈতিক শিক্ষা ও আল্লাহভিত্তিক শিক্ষা। শিক্ষাই মানুষের জীবনের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষাখাতে মাত্র ১.৬ শতাংশ থেকে ১.৮ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে দায়সারা অবস্থা তৈরি করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষাখাতের বাজেটকে ব্যয় নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত আদর্শ সমাজ গঠন সম্ভব হবে এবং একটি যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত জাতি গড়ে উঠবে।’ মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সহজভাবে মনে করি, শিক্ষা হলো একটি মানুষের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এটার মধ্যে নৈতিক শিক্ষা থাকতে হবে। সেটি আজকের স্কুল, মাদরাসা, ক্যাডেট কলেজই বলেন না কেন। আমাদের সেনাবাহিনীতে অফিসার হচ্ছেন ৯০ শতাংশ ক্যাডেট কলেজ থেকে। এরা কাটা চামচ দিয়ে ভাত খান। এরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে কাটা চামচ পাবেন কোথায়? আমরা এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করি না, কথাও বলি না।’

ডেস্ক রিপোর্ট 





















