দ্রোহের প্রতীক শরিফ ওসমান বিন হাদি। সাহস ও দেশপ্রেমেরও এক উজ্জ্বল নাম তিনি। সাদাসিধে জীবনযাপন, প্রচলিত রাজনীতির বিপরীত স্রোতে অবস্থান, আগুনঝরা বক্তব্য এবং দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণে অল্প সময়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন পরিচিত মুখ। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে শরিফ ওসমান বিন হাদি বাংলাদেশের ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হন। রাজপথে বুক চিতিয়ে সত্য উচ্চারণের যে সাহস তিনি দেখিয়েছেন, তা তাকে আলাদা করেছে সমসাময়িক রাজনীতির ভিড় থেকে।
একজন শিক্ষিত, মার্জিত ও স্পষ্টভাষী তরুণ হিসেবে হাদি রাজনীতির প্রথাগত ধারা ভেঙে নতুন পথের স্বপ্ন দেখতেন। ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণাটি ছিল সেই স্বপ্ন ও তারুণ্যের সাহসেরই প্রতিফলন। হাদির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, আন্দোলনের সহযোদ্ধা ও রাজনৈতিক সঙ্গীরা তাকে দেখেছেন এক অনমনীয় স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে।
হাদি সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “ওসমান হাদি একটি স্বপ্নের নাম। ওই স্বপ্নের মৃত্যু নেই। বিপ্লবীদের মৃত্যু নেই, কারণ বিপ্লবীরা স্বপ্নদ্রষ্টা। স্বদেশবাসী ও বিশ্বমানবতার উজ্জ্বল জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা জীবন উৎসর্গ করেন।” তিনি আরও বলেন, হাদির প্রস্থান কেবল একটি শারীরিক বিদায়; তার কর্ম, স্বদেশচিন্তা ও মূল্যবোধ চিরকাল অম্লান থাকবে। দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিসরে তার প্রাণ বিসর্জনের ক্ষতি অপূরণীয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনি গণসংযোগের সময় রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে গুলিবিদ্ধ হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জানাজা শেষে গতকাল তাকে দাফন করা হয়।
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে হাদির আত্মপ্রকাশ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে তিনি গড়ে তোলেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও কালচারাল ফ্যাসিজমের মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিলোপ, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ ছিল নির্ভীক ও উচ্চকিত। বিএনপি, জামায়াত কিংবা যে কোনো প্রভাবশালী শক্তির সমালোচনায় তিনি কখনো আপস করেননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই হাদিকে কাছ থেকে দেখেছেন তার বন্ধু মারুফ হোসাইন। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রথম স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন ওসমান হাদি। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে অল্প সময়েই তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে নীরব থাকা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও সুশীল সমাজের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন তিনিই।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বসবাসের সুবাদে সরাসরি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন হাদি। শেখ হাসিনার পতনের পর জুলাই গণহত্যার বিচার, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তিনি আরও সোচ্চার হয়ে ওঠেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে সততা ও জনতার অংশগ্রহণের নতুন ধারণা তুলে ধরেন তিনি। ভোটারদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থে নির্বাচন পরিচালনা ও সেই অর্থের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করে তিনি স্থাপন করেন অনন্য দৃষ্টান্ত।
এই ব্যতিক্রমী ও সাহসী ভূমিকা যেমন তাকে জনপ্রিয় করেছে, তেমনি শত্রুর সংখ্যাও বাড়িয়েছে। বিদেশি নম্বর থেকে হত্যার হুমকি এলেও তিনি দমে যাননি। বরং গুলির সামনে বুক পেতে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে শত্রুর প্রতিও ইনসাফের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ইনসাফ চাইলেও শত্রুরা তা মানেনি—আততায়ীর বুলেট ঝাঁজরা করে দেয় তার মাথা।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দীন মনে করেন, হাদির রেখে যাওয়া কাজ বাস্তবায়নের দায় রাষ্ট্রের। তিনি বলেন, “ওসমান হাদি ছিলেন ইনসাফভিত্তিক, ফ্যাসিবাদমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রাণপুরুষ এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় সৈনিক।” তার মতে, হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়নে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য, যার মূল ভিত্তি হবে জুলাইয়ের স্পিরিট। ভারতের কাছে নতজানু নীতি গ্রহণ করলে তা হাদি ও আবরারদের আত্মাকে কষ্ট দেবে।
হাদির আত্মত্যাগ তখনই অর্থবহ হবে, যখন একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। নির্বাচিত সরকার যদি দুর্নীতিমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত ও ফ্যাসিবাদমুক্ত ইনসাফের বাংলাদেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করে—তবেই শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির স্বপ্ন সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত হবে।
ঢাকা
,
বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
রিকশা-ভ্যান-অটোচালক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন তারেক রহমান
জামায়াত জোটের সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেবে না ইসলামী আন্দোলন: যুগ্ম মহাসচিব
ক্ষমতায় এলে হাদির হত্যার বিচার করবে বিএনপি, ইনশাআল্লাহ: মির্জা ফখরুল
গত ৮ মাস দেশেই পালিয়ে ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন, পরে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে
ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি আজ বাংলাদেশে আসছে
‘গ্রিনল্যান্ডের জনগণ রাশিয়ায় যোগ দেওয়ার পক্ষে ভোট দিতে পারে’
একটি দল ফ্যামিলি কার্ডের কথা বললেও টাকা কোথা থেকে আসবে বলছে না: নাহিদ
বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে নিবিড় নজর ভারতের, সামরিক যোগাযোগের সব চ্যানেল খোলা: সেনাপ্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদী
গ্রিল কেটে বাসায় ঢুকে জামায়াত নেতাকে খুন, টাকা-স্বর্ণ লুট
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ায় এবি পার্টির সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চাইলেন মঞ্জু
যেভাবে দ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠেন ওসমান হাদি
-
ডেস্ক রিপোর্ট - আপডেট সময় ১০:৪৩:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
- ৭০ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ






















