বোমা হামলা হয়তো আগের মতো তীব্র নয়, কিন্তু থামেনি ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যু। এবার তারা মরছে ইসরাইলি বিমান হামলায় নয়—ঠান্ডা, প্রবল বৃষ্টি আর ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়ে। দুই বছরের গণহত্যায় বিধ্বস্ত গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের, বিশেষত শিশুদের সুরক্ষার জন্য জরুরি পরিষেবা ও নিরাপদ আশ্রয়ের তীব্র প্রয়োজন থাকলেও তা পরিকল্পিতভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
আশ্রয়কেন্দ্র ও জরুরি সহায়তার প্রবেশে বাধা দিয়ে ইসরাইল যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন অব্যাহত রেখেছে। দৃশ্যমান বোমাবর্ষণ কিছুটা কমলেও অভাব, বঞ্চনা ও অনিরাপদ পরিবেশে ধীরগতির মৃত্যু চলছে—যা আগের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক।
সাম্প্রতিক প্রবল বৃষ্টিতে গাজার তাঁবু শিবির পানিতে ডুবে গেছে, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্লাবিত হয়েছে, আর ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়ে পরিবারগুলো চাপা পড়েছে। রাফাহ ক্রসিং বন্ধ থাকায় পর্যাপ্ত আশ্রয় ও জরুরি উপকরণ ঢুকতে পারছে না। এসব দুর্যোগে শিশুসহ কমপক্ষে ১৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এটিকে ‘প্রতিরোধযোগ্য বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, খারাপ আবহাওয়া নয়—ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনই এসব মৃত্যুর মূল কারণ। গত দুই মাসের বেশি সময়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইসরাইল ১,৪০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা বা আহত করেছে। একই সঙ্গে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন মেরামতের উপকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা কঠোরভাবে আটকে রাখা হয়েছে—যদিও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের উপদেষ্টারা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব মানার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইউএনআরডব্লিউএর কাছে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের জন্য আশ্রয়সামগ্রী প্রস্তুত থাকলেও সেগুলো গাজায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। গাজার অন্তত ৯২ শতাংশ স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত, আর প্রায় ৫৮ শতাংশ ভূখণ্ড ফিলিস্তিনিদের জন্য নিষিদ্ধ। ফলে অধিকাংশ মানুষ জীর্ণ তাঁবুতে কিংবা ঝুলে থাকা কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য।
ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ ভাঙতে আগে খাদ্যকে অস্ত্র বানানো হয়েছিল; এখন প্রকৃতিকে পরিণত করা হয়েছে যুদ্ধের নতুন অস্ত্রে। অ্যামনেস্টির তদন্তকারীরা জাবালিয়া, আল-রিমাল, শেখ রাদওয়ান ও আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে ভবন ধসের একাধিক ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন—যাতে পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়েছে। ঝড়ে মোহাম্মদ নাসারের দুই সন্তান লিনা ও গাজির মৃত্যু তার করুণ উদাহরণ। বিমান হামলা থেকে বেঁচে ফিরে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল—ভেবেছিল ভেজা তাঁবুর চেয়ে কংক্রিট নিরাপদ। ঝড়ে সেটিও ভেঙে পড়ে।
এক মাস আগেই ইউএনআরডব্লিউএ কঠোর শীতের সতর্কতা দিয়ে জরুরি আশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছিল। গাজার বাইরে প্রস্তুত সামগ্রী প্রবেশের ‘সবুজ সংকেত’ এখনও মেলেনি। সতর্কবার্তাগুলো ইসরাইলের বধির কান ও হৃদয়হীন অন্তরে কোনো সাড়া ফেলেনি।
অক্ষুণ্ণ অবরোধের মধ্যেই ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতিতে গাজা এভাবেই দিন কাটাচ্ছে। অ্যামনেস্টির উপসংহার স্পষ্ট—ইসরাইল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন জীবনযাত্রার পরিস্থিতি তৈরি করছে যাতে গাজার ফিলিস্তিনিরা একের পর এক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। বোমা দিয়ে গাজাকে বসবাস অযোগ্য না করলেও, প্রকৃতি ও অবরোধের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য পূরণ করা হচ্ছে।
একদিকে শিশুরা ঠান্ডায় মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি’র দাবি শোনা যাচ্ছে—যে শান্তির মাপকাঠিতে কেবল এক পক্ষের জীবনই গণ্য হয়। যতদিন এক পক্ষের মৃত্যু উপেক্ষিত থাকবে আর অন্য পক্ষের ‘স্বস্তি’কেই শান্তি বলা হবে, প্রকৃত শান্তি আসবে না।
পশ্চিম তীরেও একই সহিংসতা চলছে। গাজা ডুবে গেলে বুলডোজার পশ্চিম তীরের শরণার্থী শিবিরে ঘর ভাঙছে, বসতি স্থাপনকারীরা ঘরবাড়ি ও জলপাই বাগানে আগুন দিচ্ছে। তুলকারেমের কাছে নূর শামস শিবিরে আরও ২৫টি ফিলিস্তিনি বাড়ি ভাঙার নির্দেশ জারি হয়েছে। ৭৭ বছর পর আবারও শত শত মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মুখে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন স্পষ্ট—দখলদার শক্তি হিসেবে খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও অবকাঠামোর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। শিশুদের হিমায়িত কবরের ওপর দাঁড়ানো এই তথাকথিত শান্তি আবহাওয়ার ফল নয়; এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ। এটি শান্তি নয়—এ এক ভিন্ন রূপের গণহত্যা।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর। অনুবাদ: মাহফুজুর রহমান
ঢাকা
,
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
বাউফলে নির্বাচন ঘিরে একাধিক সহিংসতা; পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বিএনপি—জামায়াতের
১১ দলীয় জোটের চূড়ান্ত আসন ঘোষণা
১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত, সর্বোচ্চ ১৯০ আসন জামায়াতে ইসলামী
ভোলায় বালিশ চাপায় স্ত্রীকে হত্যা, পাষণ্ড স্বামী আটক
ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ড বিতরণ বন্ধের দাবি জামায়াতের, সিইসির সঙ্গে বৈঠকে প্রটোকল সমতার আহ্বান
জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি ও তথ্য বিক্রি করে মাসে কোটি টাকার বেশি আয়; নির্বাচন কমিশনের দুই কর্মচারী গ্রেফতার
বাউফলে ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়ে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ
বাউফলে জামায়াতের নেতা–কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন
শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন রাশেদ প্রধান
‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ নামে নির্বাচনে অংশ নেবে ১১ দল
বোমা হামলা কমলেও কেন প্রাণ হারাচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা?
-
ডেস্ক রিপোর্ট - আপডেট সময় ০৮:৪৫:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
- ১০৬ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ



























