কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাষ্ট্রহীন, বিচ্ছিন্ন ও হতাশ একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠছে এবং এটি উগ্রবাদ এবং সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের প্রজনন ক্ষেত্র হতে পারে সতর্ক করেছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘ইতিহাস বলে, যে আমরা যদি অবহেলা করি, তবে এই মানুষগুলো একদিন আমাদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র তুলে নেবে। সেই দিন আসার আগেই আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সোমবার (২৪ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চ্যালেঞ্জ : আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জাতীয় অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক ইস্যু নয়। এটি একই সঙ্গে একটি হিউম্যান সিকিউরিটি বা মানব নিরাপত্তা উদ্বেগ, একটি জাতীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, একটি কূটনৈতিক দ্বিধা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি। সমস্যাটিকে এক শব্দে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা ছিল একটি পরিকল্পনা ছাড়া আমন্ত্রিত বোঝা।
এ সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, সেখানে বর্তমানে ৬ থেকে ১১টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। ক্যাম্পের মধ্য দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক অবাধে চলাচল করছে। ২০১৭ সাল থেকে পুলিশ ২ হাজার ৪০০-এর বেশি মামলা করেছে এবং ২৬০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। এছাড়া, আশ্রয় ও জ্বালানি কাঠের জন্য ক্যাম্প এলাকায় ৪৪ বর্গকিলোমিটার বন উধাও হয়ে গেছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন ক্যাম্পগুলোতে ৯৬টি শিশু জন্ম নিচ্ছে। ফলে কোনো ভবিষ্যৎ ও আশা ছাড়া একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। যেখানে কোনো ভবিষ্যৎ নেই, সেখানে উগ্রবাদের জন্য একটি উর্বর জমি তৈরি হয়। ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা প্রজন্মকে রাষ্ট্রহীন, বিচ্ছিন্ন ও হতাশ জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি উগ্রবাদ ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টি করেনি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকেই এর ভার বহন করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, গত নয় বছরে বাংলাদেশ অসাধারণ উদারতা দেখিয়েছে। তবে এই উদারতাকে অনির্দিষ্টকালের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তার মতে, রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব স্থায়ীভাবে গ্রহণ করা বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য নৈতিক বা কৌশলগতভাবে কার্যকর নয়। তাই প্রত্যাবাসনের জন্য সক্রিয় ও নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক চাপ এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই নিরাপত্তা কৌশল প্রয়োজন।
ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ এই সমস্যা তৈরি করেনি, আবার বাংলাদেশ একাই এই অন্তর্নিহিত সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, আমরা তা বুঝি। তিনি বলেন, নয় বছর ধরে প্রত্যাবাসন না হওয়ায় বাংলাদেশ এখন নীরব কূটনীতির বাইরে গিয়ে জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, চীন, ভারতসহ সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো, রোহিঙ্গা সংকটকে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে ফ্রেমিং করা এবং টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়বদ্ধ করা।
রোহিঙ্গা সংকটকে চীন ও ভারত যাতে নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে, বক্তব্যে সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, সশস্ত্র নেটওয়ার্ক ধ্বংস, নিয়োগ বন্ধ এবং ক্যাম্পে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক করা হয়েছে। বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সুনিশ্চিত প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে থাকা প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য হিসেবে যাচাই করেছে, এমন ঘোষণার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার শর্তের কারণে এর মধ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। মিয়ানমারের এই যাচাইকে বাংলাদেশের চলমান প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়ায় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। একইসঙ্গে, আন্তর্জাতিক চাপ কমানো এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান গণহত্যার মামলার প্রেক্ষাপটেও এ ঘোষণাকে বিবেচনা করা যেতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























