ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মালপাহাড়িয়া মাতৃভূমি: মোল্লাপাড়ার ইতিহাস ও উচ্ছেদের শঙ্কা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০২:২৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ২৪৫ বার পড়া হয়েছে

চলতি আলাপখানির শিরোনাম দিতে চেয়েছিলাম মালপাহাড়িয়া জাতির মালতো ভাষায়, ‘জারাম ক্ষেক্ষলা তেইলাম, জারাম ক্ষেক্ষলদূ তেইলান’। বাংলায় এর মানে ‘আমরা জন্মমাটি ছাড়ব না, জন্মভূমি ছাড়ব না’। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট পরিচালিত ২০১৮ সালের ভাষা জরিপে দেশের ১৪টি আদিবাসী মাতৃভাষাকে বিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ভেতর মালতো ভাষা একটি। ভাষাবিদ সুকুমার সেন তার ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ (১৯৪৫) বইতে মালপাহাড়িয়া ভাষাকে দ্রাবিড় ভাষার কন্নাড়ি শাখার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেছেন। কৃষ্ণচন্দ্র টুডু অবশ্য মালতো ভাষাকে দ্রাবিড়ীয় ভাষা গোষ্ঠীর উত্তরীয় শাখার একটি ভাষা বলে মনে করেন।

 

এই মালতো ভাষা গত কয়েকবছরে আরও বিপন্নতর ও রক্তাক্ত হয়েছে। কারণ এই ভাষাভাষী মানুষেরা নিজ ভূমিতে নিজের জীবন নিয়েই বাঁচতে পারছেন না, সেখানে মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখা এক জটিলতম প্রশ্ন। সম্প্রতি রাজশাহীর মোল্লাপাড়াতে গ্রাম উচ্ছেদ নিয়ে মালতোভাষীরা আবারও আলোচনায় এসেছেন। মোল্লাপাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলের এক মালপাহাড়িয়া আদিবাসী গ্রাম। আগে এই জায়গাটি ‘ইন্দ্র ধূপির বাথান’ নামে পরিচিত ছিল। পরে এখানে মালপাহাড়িয়াদের বসত গড়ে ওঠে এবং জায়গাটি ‘আদিবাসীপাড়া’ নামে পরিচিতি পায়। পাড়াটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২ নং ওয়ার্ডের কাশিয়াডাঙ্গা থানার হড়গ্রাম মৌজায় অবস্থিত। সাঁওতালি ভাষায় ‘হড়’ মানে মানুষ। আগে এই এলাকায় সাঁওতাল, মালপাহাড়িয়া, ওঁরাও আদিবাসীদের প্রাচীন বসতি ছিল। পাড়াটিকে মানুষ বোর্ডঘর নামেও চেনে।

 

মোল্লাপাড়ার সর্বপ্রবীণ ফুলমনি বিশ্বাস। এই পাড়াটি প্রথম যারা গড়ে তুলেছিলেন তার ভেতর ফুলমনির পিতা সূর্য মালপাহাড়ি এবং মা সুরু মালপাহাড়িও ছিলেন। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার জন্মতারিখ লেখা আছে ২২-৫-১৯৩৭, কিন্তু কোনো ‘পদবি’ লেখা নেই। প্রায় নব্বই বছরের ফুলমণির সংসার এবং স্বজনদের জন্ম-মৃত্যু সবই হয়েছে এই পাড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার এক ছেলে মারা যায়, শৈশবে হারান দুই পুত্র। কালনী, গোপাল, যশোদা, সরলা, অধীর, সুধীরের বিয়ে হয়েছে এই পাড়া থেকেই। তার এক মেয়ে সরলা বিশ্বাসের জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ লেখা আছে ২০-৩-১৯৮১। সরলার মেয়ে রূপালীর বিয়ে হয়েছে দিনাজপুরের এক মুন্ডা ছেলের সঙ্গে। ফুলমণির অন্য ছেলেরা বিয়ে করে এই পাড়াতেই আছে। সবার সংসার বেড়েছে। বাড়েনি মাটি। প্রথমে ৬টি পরিবার বসতি গড়ে তুললেও আজ হয়েছে ১৬ পরিবার।

 

দীর্ঘ ষাট বছর পর মালপাহাড়িয়া গ্রামটি দখল করে উচ্ছেদ করতে মরিয়া হয়েছেন সাজ্জাদ আলী নামের এক বাঙালি দখলদার। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ তৎপর হয়। আপাতত উচ্ছেদ বন্ধ আছে। কিন্তু মোল্লাপাড়ায় শঙ্কা, সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি। অনেকেই দখলদারের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পরিচয়কে সামনে আনছেন কিংবা রেজিমের প্রসঙ্গ টানছেন। কিন্তু সকল রেজিমেই, সকল রাজনৈতিক পরিচয়েই এদেশে আদিবাসী বসতভূমি দখল হয়েছে এবং অন্যায় উচ্ছেদ ঘটেছে। ভীমপুর থেকে নাহার পুঞ্জি, উপকূলের রাখাইন বসতি থেকে সুন্দরবনের মুন্ডা জনপদ, মধুপুর থেকে লামার সরই পাহাড় কিংবা বাগদাফার্ম থেকে বগুড়া।

 

 

 

ভূমি দখল ও উচ্ছেদ ঘটনার কোনো রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার না হওয়াতে আদিবাসী ভূমি দখলের অনিবার্য গণিত বৈধতা পেয়েছে। অধিপতি বাঙালি মনোজগতে এই ভূমিদখলের প্রতি প্রবল সম্মতি উৎপাদিত হয়েছে। মোল্লাপাড়ায় মালপাহাড়িয়াদের ভূমিদখলের ঘটনাটি কোনোভাবেই নতুন বা একপক্ষীয় ঘটনা নয়। আদিবাসী নিয়ে রাষ্ট্রের পাতানো বাইনারি, ঔপনিবেশিক লিগ্যাসি আর কর্তৃত্ববাদী তৎপরতা সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মোল্লাপাড়ার ভূমি এবং মালপাহাড়িয়াদের জীবনের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে দশাসই সব বৈষম্য আর বাইনারির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটি রাষ্ট্রের আমূল ভূমি সংস্কার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত। এক চিমটি বিবৃতি আর কয়েকদিনের পুলিশ পাহারা দিয়ে এর সুরাহা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক, স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন এক মৌলিক সংস্কারের পথ হতে পারে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

মালপাহাড়িয়া মাতৃভূমি: মোল্লাপাড়ার ইতিহাস ও উচ্ছেদের শঙ্কা

আপডেট সময় ০২:২৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

চলতি আলাপখানির শিরোনাম দিতে চেয়েছিলাম মালপাহাড়িয়া জাতির মালতো ভাষায়, ‘জারাম ক্ষেক্ষলা তেইলাম, জারাম ক্ষেক্ষলদূ তেইলান’। বাংলায় এর মানে ‘আমরা জন্মমাটি ছাড়ব না, জন্মভূমি ছাড়ব না’। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট পরিচালিত ২০১৮ সালের ভাষা জরিপে দেশের ১৪টি আদিবাসী মাতৃভাষাকে বিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ভেতর মালতো ভাষা একটি। ভাষাবিদ সুকুমার সেন তার ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ (১৯৪৫) বইতে মালপাহাড়িয়া ভাষাকে দ্রাবিড় ভাষার কন্নাড়ি শাখার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেছেন। কৃষ্ণচন্দ্র টুডু অবশ্য মালতো ভাষাকে দ্রাবিড়ীয় ভাষা গোষ্ঠীর উত্তরীয় শাখার একটি ভাষা বলে মনে করেন।

 

এই মালতো ভাষা গত কয়েকবছরে আরও বিপন্নতর ও রক্তাক্ত হয়েছে। কারণ এই ভাষাভাষী মানুষেরা নিজ ভূমিতে নিজের জীবন নিয়েই বাঁচতে পারছেন না, সেখানে মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখা এক জটিলতম প্রশ্ন। সম্প্রতি রাজশাহীর মোল্লাপাড়াতে গ্রাম উচ্ছেদ নিয়ে মালতোভাষীরা আবারও আলোচনায় এসেছেন। মোল্লাপাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলের এক মালপাহাড়িয়া আদিবাসী গ্রাম। আগে এই জায়গাটি ‘ইন্দ্র ধূপির বাথান’ নামে পরিচিত ছিল। পরে এখানে মালপাহাড়িয়াদের বসত গড়ে ওঠে এবং জায়গাটি ‘আদিবাসীপাড়া’ নামে পরিচিতি পায়। পাড়াটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২ নং ওয়ার্ডের কাশিয়াডাঙ্গা থানার হড়গ্রাম মৌজায় অবস্থিত। সাঁওতালি ভাষায় ‘হড়’ মানে মানুষ। আগে এই এলাকায় সাঁওতাল, মালপাহাড়িয়া, ওঁরাও আদিবাসীদের প্রাচীন বসতি ছিল। পাড়াটিকে মানুষ বোর্ডঘর নামেও চেনে।

 

মোল্লাপাড়ার সর্বপ্রবীণ ফুলমনি বিশ্বাস। এই পাড়াটি প্রথম যারা গড়ে তুলেছিলেন তার ভেতর ফুলমনির পিতা সূর্য মালপাহাড়ি এবং মা সুরু মালপাহাড়িও ছিলেন। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার জন্মতারিখ লেখা আছে ২২-৫-১৯৩৭, কিন্তু কোনো ‘পদবি’ লেখা নেই। প্রায় নব্বই বছরের ফুলমণির সংসার এবং স্বজনদের জন্ম-মৃত্যু সবই হয়েছে এই পাড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার এক ছেলে মারা যায়, শৈশবে হারান দুই পুত্র। কালনী, গোপাল, যশোদা, সরলা, অধীর, সুধীরের বিয়ে হয়েছে এই পাড়া থেকেই। তার এক মেয়ে সরলা বিশ্বাসের জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ লেখা আছে ২০-৩-১৯৮১। সরলার মেয়ে রূপালীর বিয়ে হয়েছে দিনাজপুরের এক মুন্ডা ছেলের সঙ্গে। ফুলমণির অন্য ছেলেরা বিয়ে করে এই পাড়াতেই আছে। সবার সংসার বেড়েছে। বাড়েনি মাটি। প্রথমে ৬টি পরিবার বসতি গড়ে তুললেও আজ হয়েছে ১৬ পরিবার।

 

দীর্ঘ ষাট বছর পর মালপাহাড়িয়া গ্রামটি দখল করে উচ্ছেদ করতে মরিয়া হয়েছেন সাজ্জাদ আলী নামের এক বাঙালি দখলদার। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ তৎপর হয়। আপাতত উচ্ছেদ বন্ধ আছে। কিন্তু মোল্লাপাড়ায় শঙ্কা, সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি। অনেকেই দখলদারের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পরিচয়কে সামনে আনছেন কিংবা রেজিমের প্রসঙ্গ টানছেন। কিন্তু সকল রেজিমেই, সকল রাজনৈতিক পরিচয়েই এদেশে আদিবাসী বসতভূমি দখল হয়েছে এবং অন্যায় উচ্ছেদ ঘটেছে। ভীমপুর থেকে নাহার পুঞ্জি, উপকূলের রাখাইন বসতি থেকে সুন্দরবনের মুন্ডা জনপদ, মধুপুর থেকে লামার সরই পাহাড় কিংবা বাগদাফার্ম থেকে বগুড়া।

 

 

 

ভূমি দখল ও উচ্ছেদ ঘটনার কোনো রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার না হওয়াতে আদিবাসী ভূমি দখলের অনিবার্য গণিত বৈধতা পেয়েছে। অধিপতি বাঙালি মনোজগতে এই ভূমিদখলের প্রতি প্রবল সম্মতি উৎপাদিত হয়েছে। মোল্লাপাড়ায় মালপাহাড়িয়াদের ভূমিদখলের ঘটনাটি কোনোভাবেই নতুন বা একপক্ষীয় ঘটনা নয়। আদিবাসী নিয়ে রাষ্ট্রের পাতানো বাইনারি, ঔপনিবেশিক লিগ্যাসি আর কর্তৃত্ববাদী তৎপরতা সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মোল্লাপাড়ার ভূমি এবং মালপাহাড়িয়াদের জীবনের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে দশাসই সব বৈষম্য আর বাইনারির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটি রাষ্ট্রের আমূল ভূমি সংস্কার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত। এক চিমটি বিবৃতি আর কয়েকদিনের পুলিশ পাহারা দিয়ে এর সুরাহা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক, স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন এক মৌলিক সংস্কারের পথ হতে পারে।