ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
আওয়ামী লীগ ও গণতন্ত্র কখনো একসঙ্গে যায়নি: মির্জা ফখরুল বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হলো না ইরানি খেলোয়াড়দের, ম্যাচ শেষেই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার নির্দেশ ‘এটি হাসিনার সরকার না, দেশের আত্মসম্মান বিকিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নয়’ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে কাজ করার আহ্বান ড. কামালের বিএসএফকে পুশ ইনে সহায়তার অভিযোগে বিজিবির হাতে আটক ৭ বাংলাদেশি আদ্-দ্বীনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিনের পদত্যাগ ‘তারেক রহমান আসলেও কাজ হবে না’ বলা সেই ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার নেতাকে কাঁধে তুলে স্লোগানের সময় ভিড়ের মধ্যে চড়-থাপ্পড় দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার প্রতিবাদ হিসেবে ভারতে প্রবেশ না করে দেশে ফিরেছি: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা “পদ্মা সেতুর পিলারের নিচে কারা কাটছে মাটি? উঠছে বড় প্রশ্ন”

৫৪ জেলার পানিতে বিপজ্জনক মাত্রায় আর্সেনিক-আয়রন, বাড়ছে ক্যানসারের আশঙ্কা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১১:৩২:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

পানি জীবন বাঁচায়—এটাই চিরচেনা সত্য। কিন্তু সেই পানিই যদি হয়ে ওঠে নীরব ঘাতক? সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা বলছে, দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রতিদিন যে পানি পান করছেন, তাতেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকি। ভূগর্ভস্থ পানিতে উদ্বেগজনক মাত্রায় আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।

দেশের ভূগর্ভস্থ পানিতে উদ্বেগজনক মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহার বা পান করছেন। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক একটি জার্নালেও গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

সায়েন্স ল্যাবরেটরি, বিএসটিআই এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলাতেই পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি জেলার টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক সীমার চেয়ে অনেক বেশি, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের পানি পান বা ব্যবহারের ফলে লিভারের রোগ, লিভার ক্যানসার, স্কিন ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, রক্তশূন্যতা, চোখ ও নাকের সমস্যা, জয়েন্টে ব্যথাসহ নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, অতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি লিভার, হার্ট, কিডনি, চোখ ও নাকের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। একই সঙ্গে স্কিন ক্যানসার, রক্তশূন্যতা এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও বাড়ায়।

আগারগাঁও জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলমের মতে, গর্ভবতী মা যদি দীর্ঘদিন এই ধরনের পানি ব্যবহার করেন, তাহলে গর্ভের শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও অন্যান্য নিউরোলজিক্যাল সমস্যার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তিনি জানান, এ ধরনের জটিলতা নিয়ে প্রতিদিনই অনেক শিশু চিকিৎসা নিতে আসছে।

ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ভেজাল খাদ্যের পাশাপাশি আর্সেনিকযুক্ত পানি এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তিনি। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠানে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়লেও রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

গ্যাস্ট্রোলিভার বিশেষজ্ঞ ডা. এনামুল করিম বলেন, অতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি দীর্ঘমেয়াদে লিভারসহ শরীরের প্রায় সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সফি আহমেদ মোয়াজ জানান, গর্ভাবস্থায় বিষাক্ত উপাদানযুক্ত পানির প্রভাবে অনেক শিশু জন্মগত বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। স্কিন সমস্যা, কিডনি জটিলতা এবং অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়ছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মোশতাক হোসেনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সায়েন্স ল্যাবরেটরির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৃষ্টির পানি তুলনামূলক নিরাপদ। কারণ এতে আর্সেনিক বা আয়রনের উপস্থিতি পাওয়া যায় না। ফাস্ট-ফ্লাশ প্রযুক্তির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব এবং এটি খুব বেশি ব্যয়বহুলও নয়। তাদের পরীক্ষায় ওয়াসার পানি এবং মাননিয়ন্ত্রিত বোতলজাত পানিও নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে খাবার পানিতে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৫০ মাইক্রোগ্রাম আর্সেনিক সহনীয় ধরা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই সীমা মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্য সীমাও তুলনামূলক বেশি।

এদিকে বিএসটিআইয়ের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, অনুমোদনহীন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বোতলজাত পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং জেল-জরিমানার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগ ও গণতন্ত্র কখনো একসঙ্গে যায়নি: মির্জা ফখরুল

৫৪ জেলার পানিতে বিপজ্জনক মাত্রায় আর্সেনিক-আয়রন, বাড়ছে ক্যানসারের আশঙ্কা

আপডেট সময় ১১:৩২:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

পানি জীবন বাঁচায়—এটাই চিরচেনা সত্য। কিন্তু সেই পানিই যদি হয়ে ওঠে নীরব ঘাতক? সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা বলছে, দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রতিদিন যে পানি পান করছেন, তাতেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকি। ভূগর্ভস্থ পানিতে উদ্বেগজনক মাত্রায় আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।

দেশের ভূগর্ভস্থ পানিতে উদ্বেগজনক মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহার বা পান করছেন। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক একটি জার্নালেও গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

সায়েন্স ল্যাবরেটরি, বিএসটিআই এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলাতেই পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি জেলার টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক সীমার চেয়ে অনেক বেশি, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের পানি পান বা ব্যবহারের ফলে লিভারের রোগ, লিভার ক্যানসার, স্কিন ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, রক্তশূন্যতা, চোখ ও নাকের সমস্যা, জয়েন্টে ব্যথাসহ নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, অতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি লিভার, হার্ট, কিডনি, চোখ ও নাকের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। একই সঙ্গে স্কিন ক্যানসার, রক্তশূন্যতা এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও বাড়ায়।

আগারগাঁও জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলমের মতে, গর্ভবতী মা যদি দীর্ঘদিন এই ধরনের পানি ব্যবহার করেন, তাহলে গর্ভের শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও অন্যান্য নিউরোলজিক্যাল সমস্যার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তিনি জানান, এ ধরনের জটিলতা নিয়ে প্রতিদিনই অনেক শিশু চিকিৎসা নিতে আসছে।

ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ভেজাল খাদ্যের পাশাপাশি আর্সেনিকযুক্ত পানি এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তিনি। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠানে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়লেও রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

গ্যাস্ট্রোলিভার বিশেষজ্ঞ ডা. এনামুল করিম বলেন, অতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি দীর্ঘমেয়াদে লিভারসহ শরীরের প্রায় সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সফি আহমেদ মোয়াজ জানান, গর্ভাবস্থায় বিষাক্ত উপাদানযুক্ত পানির প্রভাবে অনেক শিশু জন্মগত বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। স্কিন সমস্যা, কিডনি জটিলতা এবং অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়ছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মোশতাক হোসেনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সায়েন্স ল্যাবরেটরির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৃষ্টির পানি তুলনামূলক নিরাপদ। কারণ এতে আর্সেনিক বা আয়রনের উপস্থিতি পাওয়া যায় না। ফাস্ট-ফ্লাশ প্রযুক্তির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব এবং এটি খুব বেশি ব্যয়বহুলও নয়। তাদের পরীক্ষায় ওয়াসার পানি এবং মাননিয়ন্ত্রিত বোতলজাত পানিও নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে খাবার পানিতে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৫০ মাইক্রোগ্রাম আর্সেনিক সহনীয় ধরা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই সীমা মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্য সীমাও তুলনামূলক বেশি।

এদিকে বিএসটিআইয়ের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, অনুমোদনহীন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বোতলজাত পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং জেল-জরিমানার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিতে পারে।