ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
মহাকাশ থেকে হামলার সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনায় ইসরায়েল: কাটজ মাত্র ১ মিলিয়ন ডলারের বাজেট, বক্স অফিসে ৩৪৪ মিলিয়ন আয় ভারতীয় ভূখণ্ডে চীনা সেনা, দখলের অভিযোগ বিস্তৃত এলাকা জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস রূপপুরে আরও অনিয়ম, ২৭ কোটির যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল ২১৪ কোটিতে রুমিন ফারহানাকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ মন্তব্য বিশ্বকাপের আলোচনায় কেপ ভার্দে, বাড়ছে মুসলিম সম্প্রদায়  ভারতীয় নাগরিক হয়েও প্রধান শিক্ষকের পদে দীপক চন্দ্র, রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ কালেমা লেখা পতাকা উত্তোলনের পেছনের পরিকল্পনা সরকার খতিয়ে দেখছে: তথ্য উপদেষ্টা যুদ্ধ থামিয়ে ইসরায়েলকে গাজা পুনর্গঠনে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দেতে ইসলামের নীরব পদচারণা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৩:৩৮:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে আলোচনায় এসেছে। তবে এই আলোচনার আড়ালে দেশটির আরেকটি নীরব গল্প রয়েছেকেপ ভার্দেতে ইসলামের ধীরে ধীরে বিকাশের গল্প। সংখ্যায় অল্প হলেও এখানকার মুসলিমরা আজ দেশটির অর্থনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক দমনপীড়ন পেরিয়ে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করে তুলছেন।

২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, কেপ ভার্দের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মুসলিম। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্রে মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ হাজার। তাদের অধিকাংশই পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল, গিনিবিসাউ ও মালি থেকে আসা অভিবাসী। রাজধানী প্রাইয়া, বন্দরনগরী মিনদেলো, পর্যটননির্ভর সাল ও বোয়া ভিস্তা দ্বীপে তাদের বসবাস বেশি। সুন্নি মতাদর্শ অনুসরণকারী এসব মুসলিম মূলত খুচরা ব্যবসা, নির্মাণশিল্প, হোটেল ও পর্যটনসেবা, পরিবহন এবং হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই পশ্চিম আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী সুফি ধারাবিশেষ করে তিজানিয়া ও মুরিদ তরিকার সাংস্কৃতিক প্রভাব বহন করেন, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনাচরণে প্রতিফলিত হয়।

কেপ ভার্দেতে ইসলামের ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাব্দী পুরোনো। ১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা দ্বীপপুঞ্জে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করলে এটি দ্রুত আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেই সময় সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী এবং ক্রীতদাসদের মাধ্যমে কেপ ভার্দেতে ইসলামের প্রথম পদচিহ্ন পড়ে। ওলোফ, মানদিলকা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর বহু মুসলিম আখখেত ও গৃহস্থালি শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাদের অনেকেরই ইসলামি জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি ছিল শক্তিশালী। কিন্তু পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ক্যাথলিক ধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। অনেক মুসলিম ক্রীতদাসকে জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয় এবং কোরআন তেলাওয়াত কিংবা প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে ঔপনিবেশিক যুগে কোনো স্থায়ী ইসলামি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারেনি।

তবু ইসলামের সব চিহ্ন মুছে যায়নি। স্থানীয় ক্রেওল ভাষা ও সংস্কৃতিতে ওলোফ ও মানদিলকা ভাষার কিছু শব্দ এবং পশ্চিম আফ্রিকান মুসলিম সংস্কৃতির কিছু উপাদান আজও সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। বর্তমানে দাপ্তরিক পর্তুগিজ ভাষার বাইরেও অভিবাসী মুসলিমদের মাঝে ফরাসি ও ওলোফ ভাষার চর্চা তাদের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কেপ ভার্দের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে মুসলিমরা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ধর্মচর্চার সুযোগ পান। ১৯৮০ ও ১৯৯০এর দশকে পর্যটনশিল্পের বিকাশ, বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় দেশের প্রথম সরকারি স্বীকৃত মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মুসলিমদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ২০১৪ সালে অন্তত ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার আইন কার্যকর হলে মুসলিম সংগঠনগুলো আইনি মর্যাদা ও করসুবিধা লাভ করে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

মহাকাশ থেকে হামলার সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনায় ইসরায়েল: কাটজ

ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দেতে ইসলামের নীরব পদচারণা

আপডেট সময় ০৩:৩৮:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে আলোচনায় এসেছে। তবে এই আলোচনার আড়ালে দেশটির আরেকটি নীরব গল্প রয়েছেকেপ ভার্দেতে ইসলামের ধীরে ধীরে বিকাশের গল্প। সংখ্যায় অল্প হলেও এখানকার মুসলিমরা আজ দেশটির অর্থনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক দমনপীড়ন পেরিয়ে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করে তুলছেন।

২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, কেপ ভার্দের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মুসলিম। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্রে মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ হাজার। তাদের অধিকাংশই পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল, গিনিবিসাউ ও মালি থেকে আসা অভিবাসী। রাজধানী প্রাইয়া, বন্দরনগরী মিনদেলো, পর্যটননির্ভর সাল ও বোয়া ভিস্তা দ্বীপে তাদের বসবাস বেশি। সুন্নি মতাদর্শ অনুসরণকারী এসব মুসলিম মূলত খুচরা ব্যবসা, নির্মাণশিল্প, হোটেল ও পর্যটনসেবা, পরিবহন এবং হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই পশ্চিম আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী সুফি ধারাবিশেষ করে তিজানিয়া ও মুরিদ তরিকার সাংস্কৃতিক প্রভাব বহন করেন, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনাচরণে প্রতিফলিত হয়।

কেপ ভার্দেতে ইসলামের ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাব্দী পুরোনো। ১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা দ্বীপপুঞ্জে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করলে এটি দ্রুত আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেই সময় সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী এবং ক্রীতদাসদের মাধ্যমে কেপ ভার্দেতে ইসলামের প্রথম পদচিহ্ন পড়ে। ওলোফ, মানদিলকা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর বহু মুসলিম আখখেত ও গৃহস্থালি শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাদের অনেকেরই ইসলামি জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি ছিল শক্তিশালী। কিন্তু পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ক্যাথলিক ধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। অনেক মুসলিম ক্রীতদাসকে জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয় এবং কোরআন তেলাওয়াত কিংবা প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে ঔপনিবেশিক যুগে কোনো স্থায়ী ইসলামি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারেনি।

তবু ইসলামের সব চিহ্ন মুছে যায়নি। স্থানীয় ক্রেওল ভাষা ও সংস্কৃতিতে ওলোফ ও মানদিলকা ভাষার কিছু শব্দ এবং পশ্চিম আফ্রিকান মুসলিম সংস্কৃতির কিছু উপাদান আজও সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। বর্তমানে দাপ্তরিক পর্তুগিজ ভাষার বাইরেও অভিবাসী মুসলিমদের মাঝে ফরাসি ও ওলোফ ভাষার চর্চা তাদের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কেপ ভার্দের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে মুসলিমরা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ধর্মচর্চার সুযোগ পান। ১৯৮০ ও ১৯৯০এর দশকে পর্যটনশিল্পের বিকাশ, বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় দেশের প্রথম সরকারি স্বীকৃত মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মুসলিমদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ২০১৪ সালে অন্তত ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার আইন কার্যকর হলে মুসলিম সংগঠনগুলো আইনি মর্যাদা ও করসুবিধা লাভ করে।