এবার ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন তথা ৩ হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। এ তথ্য জানিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না পেলে সামরিক প্রশিক্ষণ কমাতে হবে। গত মে মাসে দেয়া সর্বশেষ হিসাবের তুলনায় এ ব্যয় প্রায় ৮০০ কোটি ডলার বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পিট হেগসেথ। এমন অবস্থায় আরও অর্থ বরাদ্দ ও যুদ্ধের ব্যয় বাড়ানো নিয়ে কংগ্রেসে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত পুনরায় শুরুর পর মার্কিন সিনেটের বরাদ্দবিষয়ক কমিটির সামনে প্রথমবারের মতো হাজির হয়ে হেগসেথ এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আইনপ্রণেতারা জরুরিভিত্তিতে অর্থায়নের অনুমোদন না দিলে সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কমাতে হবে। তিনি জানান, তার দপ্তরের জন্য কংগ্রেসের কাছে ৮৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭ বিলিয়ন ডলার মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত সামরিক অভিযানের জন্য ব্যয় করা হবে। শুনানি চলাকালে যুদ্ধবিরোধীরা একাধিকবার তাকে বাধা দেন। তাদের কয়েকজনকে ‘ইরান ও ফিলিস্তিনে আমাদের শিশুদের ওপর বোমা হামলা বন্ধ করো’ বলে স্লোগান দিতে শোনা যায়।
বিবিসি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে সিনেট কমিটির সামনে হাজির হন হেগসেথ। এর আগে গত এপ্রিল মাসে হোয়াইট হাউস আগামী অর্থবছরের জন্য পেন্টাগনের বাজেটে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দের অনুরোধ জানায়। অনুমোদন পেলে আধুনিক ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এদিকে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) টানা ১১তম দিনের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবারের শুনানির শুরুতে হেগসেথ বলেন, ‘আমরা একটি বিপজ্জনক পৃথিবীতে বাস করছি’। তাই দ্রুত ও সাহসী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিক্ষোভকারীদের বাধার পর তিনি বলেন, এ অর্থায়নের আবেদন অত্যন্ত জরুরি সময়ে করা হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রতিপক্ষ যেন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে না পারে, সে জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। হেগসেথ বলেন, ‘এই অর্থ না পেলে আমাদের বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়তে হবে। এতে সেনাসদস্যদের বেতন পরিশোধ, দ্রুত অস্ত্র ও গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হুমকির মুখে পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, বরাদ্দ পাওয়া প্রতিটি ডলার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ‘প্রাণঘাতী সক্ষমতা’ বাড়াতে এবং ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করা হবে। সিনেটের বরাদ্দবিষয়ক কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান সুসান কলিন্স জানতে চান, প্রয়োজনীয় বাজেট না পেলে কী ধরনের প্রভাব পড়বে। জবাবে হেগসেথ বলেন, অর্থ না পেলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সামরিক প্রশিক্ষণ কমাতে হবে। এ জন্য তিনি বারবার সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে দায়ী করেন। তার অভিযোগ, বাইডেন প্রশাসন সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন দেয়নি।
কমিটিতে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ সদস্য প্যাটি মারে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, এর ‘খুব বেশি যৌক্তিকতা নেই’ এবং ট্রাম্প প্রশাসন স্বাভাবিক বাজেট অনুমোদন প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ডিক ডারবিন জানতে চান, ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কত অর্থ ব্যয় হয়েছে তার কোনও হিসাব আছে কি না। জবাবে হেগসেথ ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের তথ্য প্রকাশ করেন। পেন্টাগন প্রধান দাবি করেন, এ অর্থ অনুমোদন পেলে তা হবে ‘এক প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ’। এতে যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের পেছনে পড়ে যাবে না এবং সামরিক দিক থেকে এগিয়ে থাকবে।
এর আগে গত ১২ মে সর্বশেষ সরকারি হিসাবে পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলার। পেন্টাগন এর আগে আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছিল, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর গত সপ্তাহে আবারও সংঘাত শুরু হয়। মঙ্গলবারের শুনানিতে নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ড অভিযোগ করেন, সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা যখন পরিবারের খাবারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে ‘বোমা কেনার জন্য সীমাহীন অর্থ’ চাইছে।
তিনি প্রশ্ন করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন দাবি করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে ইতোমধ্যেই জিতে গেছে, তখন আবার কেন এ যুদ্ধের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চাওয়া হচ্ছে। জবাবে হেগসেথ বলেন, ‘আমি সঠিক সময়ে সঠিক বোমার জন্য অর্থ চাইছি।’ বিবিসি বলছে, অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন অধিকাংশ ডেমোক্র্যাট। এমনকি রিপাবলিকান দলেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। রিপাবলিকান দলের ব্যয়সংকোচনপন্থি সদস্যদের কেউ কেউ চান, এ অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে অন্য খাতে বরাদ্দ কমানো হোক। এদিকে বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন শেষ হচ্ছে। এরপর কংগ্রেসের দুই কক্ষ সেপ্টেম্বরের আগে একসঙ্গে আর অধিবেশনে বসবে না। ফলে রিপাবলিকানরা প্রয়োজনীয় ভোট জোগাড় করতে পারলেও পেন্টাগনের হাতে এ অর্থ পৌঁছাতে আরও কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট 



















