ঢাকা , রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
মদিনার ইসলামের কথা বলে মাদ্রাসাছাত্রদের পাশে দাঁড়াননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: পাটওয়ারী সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিলো সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের স্বার্থে জোট বাঁধছে জামায়াত-আওয়ামী লীগ: রাশেদ খাঁন রবিবার সংসদ অভিমুখে জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের পদযাত্রা এবার পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির মামলার পেঁচে মমতা এখনই বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের তুলনা করতে চাই না: সারজিস চাঁদাবাজি, দমন-পীড়ন, লুটপাট ও দলীয়করণ আবার ফিরে এসেছে: গোলাম পরওয়ার রয়েল রিসোর্টে আমাকে হত্যার ষড়যন্ত্র সফল হয়নি: মামুনুল হক নেপালে ভয়াবহ দুর্যোগে মৃত বেড়ে ৬৭৫: নিখোঁজ ৩২০ বিদেশি; উদ্ধার ২৪৯৮ ‘চোখের সামনে গোটা গ্রাম উধাও’

‘চোখের সামনে গোটা গ্রাম উধাও’

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:৪৮:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

হাসপাতালের দেয়ালজুড়ে সারি সারি নিখোঁজ মানুষের ছবি। সদ্য লাগানো আঠার দাগ এখনো শুকায়নি। কোনো পোস্টারে স্কুলড্রেস পরা হাস্যোজ্জ্বল কিশোরী, কোথাও গোলগাল গালের নিষ্পাপ শিশু, আবার কোনো ছবিতে বিয়ের দিনের হাসিমুখের দম্পতি। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ কিংবা দরজার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া তরুণীর ছবিও রয়েছে সেখানে। প্রতিটি ছবির পেছনে আছে একটি করে পরিবারের উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা আর স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি। হিমালয়জুড়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় গ্রাম ও জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর নেপাল ও তিব্বতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে সবশেষ জানা যায়, নেপালে এখন পর্যন্ত ৬৬৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্গম অনেক এলাকায় এখনো শুধু সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারের মাধ্যমেই পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা বলছেন, কাদার নিচে আরও কত মানুষ চাপা পড়ে থাকতে পারেন, তা নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মৃতদের শনাক্ত করাও হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ। নেপালের চিতওয়ান শহরে মরদেহের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে মর্গগুলোতে আর জায়গা নেই। এ কারণে মৃতদেহ রাখার জন্য একটি অস্থায়ী ভবন তৈরি করা হয়েছে। বন্যার প্রবল স্রোতে কিছু মরদেহ নদীপথে অনেক দূরে ভেসে গিয়ে প্রতিবেশী ভারত থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে।

 

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালে নিখোঁজ স্বজনদের খবরের আশায় ভিড় করছেন উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা। দুর্যোগের চার দিন পরও পুলিশ ডেস্কের সামনে মানুষের ভিড় কমেনি। সেখানে তারা নিখোঁজ স্বজনদের নাম নিবন্ধন করছেন। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে শত শত আহত ব্যক্তি চিকিৎসাধীন। স্বজনেরা মরিয়া হয়ে রোগীদের তালিকা খুঁজে দেখছেন—কোনোভাবে যদি প্রিয়জন জীবিত থাকার খবর পাওয়া যায়। দুর্যোগকবলিত অনেক এলাকা প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় কোনো তথ্য না পেয়ে বহু পরিবার নিখোঁজ স্বজনদের ছবি দিয়ে পোস্টার তৈরি করে হাসপাতালে লাগাচ্ছে। তাদের প্রত্যাশা, কেউ হয়তো ছবিগুলো দেখে প্রিয়জনের কোনো সন্ধান দিতে পারবেন।

 

রুসাওয়া জেলার জয়দাদা গ্রামটি পুরোপুরি ভেসে যাওয়ার পর ইয়াভরাজ লামার বোন, তার স্বামী ও তাদের দুই সন্তান নিখোঁজ রয়েছেন। হাসপাতালের দেয়ালে এক বছর বয়সী শিশু সিজান তাওয়াংয়ের ছবি লাগানোর সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন লামা। ছবিতে দেখা যায়, মায়ের কোলে থাকা ছোট্ট সিজানকে। পাশে টাঙানো ছিল তার ১২ বছর বয়সী ভাই সাহিলের ছবিও। লামা বলেন, ‘আমরা যেন অনুভূতিহীন হয়ে গেছি। কতটা দুঃখ ও হতাশার মধ্যে আছি, তা বলার মতো কোনো শব্দ নেই। আমাদের মূল লক্ষ্য এখন শিশু সিজানকে খুঁজে বের করা। সে খুবই মিষ্টি ও নিষ্পাপ ছিল। সে আর আমাদের সঙ্গে নেই এটা ভাবাও আমাদের জন্য অসম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু তাদের পুরো গ্রামই যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তখন তাদের কেউ বেঁচে আছে এমন আশা করারও আর কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।’

 

নিখোঁজ স্বামী বিশাল নেপালির (৩০) ছবি হাসপাতালের দেয়ালে টাঙানোর সময় ২২ বছর বয়সী মনিতা নেপালি কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাত্র ছয় মাস আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। পেশায় চালক বিশাল নিয়মিত নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় যাতায়াত করতেন। বন্যা আঘাত হানার এক ঘণ্টা আগে রুসাওয়ায় সকালে হাঁটতে বেরিয়ে স্বামীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন মনিতা। সেদিন সন্ধ্যায় ফোন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিশাল। কিন্তু এরপর থেকে তার ফোন আর চালু হয়নি। মনিতা বলেন, ‘তাকে ছাড়া এই পৃথিবীতে আমি বেঁচে থাকতে চাই না।’ চার দিন পেরিয়ে গেলেও স্বামী ফিরে আসবেন এই আশা ছাড়েননি তিনি। তার ভাষায়, ‘আমার হৃদয় বলছে, সে ফিরে আসবে।’

 

কিছু পরিবারের জন্য ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে তা মেনে নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। ৩৬ বছর বয়সী তুলমায়া তামাং তার পরিবারের নিখোঁজ ১২ সদস্যের কয়েকজনের ছবি নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুও রয়েছে। রুসাওয়ার একটি গ্রামে বসবাসকারী এসব স্বজন বন্যার পর থেকে নিখোঁজ। তুলমায়া বলেন, ‘আমাদের পরিবার প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এত মানুষ হারিয়ে গেছে, আর যারা বেঁচে আছি, তারাও কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’ স্বজনদের জীবিত থাকার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসায় এখন অন্তত মরদেহগুলো উদ্ধারের প্রত্যাশা করছেন তারা। তুলমায়া বলেন, ‘মরদেহগুলো যদি পাওয়া যেত, তাহলে অন্তত আমরা কিছুটা শান্তি পেতাম। তা না হলে পরিবার কখনোই ভাবা বন্ধ করতে পারবে না কী হয়েছিল। এই কষ্ট অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকবে।’

 

নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৯০০ জন ত্রিশুলি নদী করিডোরের বিস্তীর্ণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে কাজ করতেন। হিমালয়ের উঁচু এলাকায় অবস্থিত এসব প্রকল্প বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজ শ্রমিকদের অনেকেই স্বল্প বেতনের শ্রমিক। তাদের মধ্যে অন্তত ৬৩ জন ভারতের নাগরিক। শুক্রবার প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেল থেকে ঘন কাদার স্তর ভেদ করে কয়েকজন জীবিত ব্যক্তিকে টেনে বের করছেন নেপালি সেনারা।

 

নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ওই টানেলের ভেতর আরও অন্তত ১০০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন। এ ছাড়া ত্রিশুলি-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ অংশেও কয়েক ডজন মানুষ আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের একজন ২৪ বছর বয়সী সুজন নেপালি। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে রাতের শিফট শেষ করে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। তখনই উপত্যকা দিয়ে প্রবল পানির স্রোত নেমে আসে। নেপালের একটি হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে সুজনের বোন সুশিশা মালুয়ার প্রতিদিন উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছেন। হাসপাতালের তালিকায় ভাইয়ের নাম আছে কি না, তা দেখতে তিনি প্রতিদিন ফিরে আসছেন। সুশিশা বলেন, ‘আমরা আশা হারাইনি। হাসপাতালগুলোতে তার নাম লিখে রাখছি এবং সর্বত্র তার ছবি লাগাচ্ছি—এই আশায় যে কোথাও না কোথাও হয়তো তাকে খুঁজে পাব। হয়তো তাঁকে ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। হয়তো তিনি কোনোভাবে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে আছেন।’

 

নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে দুর্গম এলাকা, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারীদের সামনে প্রতিনিয়তই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। আর হাসপাতালের দেয়ালে ঝুলতে থাকা প্রতিটি পোস্টার যেন নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার শেষ আশাটুকুই ধরে রেখেছে।

 

সূত্র: গার্ডিয়ান

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

মদিনার ইসলামের কথা বলে মাদ্রাসাছাত্রদের পাশে দাঁড়াননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: পাটওয়ারী

‘চোখের সামনে গোটা গ্রাম উধাও’

আপডেট সময় ১০:৪৮:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

হাসপাতালের দেয়ালজুড়ে সারি সারি নিখোঁজ মানুষের ছবি। সদ্য লাগানো আঠার দাগ এখনো শুকায়নি। কোনো পোস্টারে স্কুলড্রেস পরা হাস্যোজ্জ্বল কিশোরী, কোথাও গোলগাল গালের নিষ্পাপ শিশু, আবার কোনো ছবিতে বিয়ের দিনের হাসিমুখের দম্পতি। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ কিংবা দরজার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া তরুণীর ছবিও রয়েছে সেখানে। প্রতিটি ছবির পেছনে আছে একটি করে পরিবারের উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা আর স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি। হিমালয়জুড়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় গ্রাম ও জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর নেপাল ও তিব্বতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে সবশেষ জানা যায়, নেপালে এখন পর্যন্ত ৬৬৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্গম অনেক এলাকায় এখনো শুধু সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারের মাধ্যমেই পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা বলছেন, কাদার নিচে আরও কত মানুষ চাপা পড়ে থাকতে পারেন, তা নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মৃতদের শনাক্ত করাও হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ। নেপালের চিতওয়ান শহরে মরদেহের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে মর্গগুলোতে আর জায়গা নেই। এ কারণে মৃতদেহ রাখার জন্য একটি অস্থায়ী ভবন তৈরি করা হয়েছে। বন্যার প্রবল স্রোতে কিছু মরদেহ নদীপথে অনেক দূরে ভেসে গিয়ে প্রতিবেশী ভারত থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে।

 

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালে নিখোঁজ স্বজনদের খবরের আশায় ভিড় করছেন উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা। দুর্যোগের চার দিন পরও পুলিশ ডেস্কের সামনে মানুষের ভিড় কমেনি। সেখানে তারা নিখোঁজ স্বজনদের নাম নিবন্ধন করছেন। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে শত শত আহত ব্যক্তি চিকিৎসাধীন। স্বজনেরা মরিয়া হয়ে রোগীদের তালিকা খুঁজে দেখছেন—কোনোভাবে যদি প্রিয়জন জীবিত থাকার খবর পাওয়া যায়। দুর্যোগকবলিত অনেক এলাকা প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় কোনো তথ্য না পেয়ে বহু পরিবার নিখোঁজ স্বজনদের ছবি দিয়ে পোস্টার তৈরি করে হাসপাতালে লাগাচ্ছে। তাদের প্রত্যাশা, কেউ হয়তো ছবিগুলো দেখে প্রিয়জনের কোনো সন্ধান দিতে পারবেন।

 

রুসাওয়া জেলার জয়দাদা গ্রামটি পুরোপুরি ভেসে যাওয়ার পর ইয়াভরাজ লামার বোন, তার স্বামী ও তাদের দুই সন্তান নিখোঁজ রয়েছেন। হাসপাতালের দেয়ালে এক বছর বয়সী শিশু সিজান তাওয়াংয়ের ছবি লাগানোর সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন লামা। ছবিতে দেখা যায়, মায়ের কোলে থাকা ছোট্ট সিজানকে। পাশে টাঙানো ছিল তার ১২ বছর বয়সী ভাই সাহিলের ছবিও। লামা বলেন, ‘আমরা যেন অনুভূতিহীন হয়ে গেছি। কতটা দুঃখ ও হতাশার মধ্যে আছি, তা বলার মতো কোনো শব্দ নেই। আমাদের মূল লক্ষ্য এখন শিশু সিজানকে খুঁজে বের করা। সে খুবই মিষ্টি ও নিষ্পাপ ছিল। সে আর আমাদের সঙ্গে নেই এটা ভাবাও আমাদের জন্য অসম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু তাদের পুরো গ্রামই যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তখন তাদের কেউ বেঁচে আছে এমন আশা করারও আর কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।’

 

নিখোঁজ স্বামী বিশাল নেপালির (৩০) ছবি হাসপাতালের দেয়ালে টাঙানোর সময় ২২ বছর বয়সী মনিতা নেপালি কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাত্র ছয় মাস আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। পেশায় চালক বিশাল নিয়মিত নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় যাতায়াত করতেন। বন্যা আঘাত হানার এক ঘণ্টা আগে রুসাওয়ায় সকালে হাঁটতে বেরিয়ে স্বামীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন মনিতা। সেদিন সন্ধ্যায় ফোন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিশাল। কিন্তু এরপর থেকে তার ফোন আর চালু হয়নি। মনিতা বলেন, ‘তাকে ছাড়া এই পৃথিবীতে আমি বেঁচে থাকতে চাই না।’ চার দিন পেরিয়ে গেলেও স্বামী ফিরে আসবেন এই আশা ছাড়েননি তিনি। তার ভাষায়, ‘আমার হৃদয় বলছে, সে ফিরে আসবে।’

 

কিছু পরিবারের জন্য ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে তা মেনে নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। ৩৬ বছর বয়সী তুলমায়া তামাং তার পরিবারের নিখোঁজ ১২ সদস্যের কয়েকজনের ছবি নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুও রয়েছে। রুসাওয়ার একটি গ্রামে বসবাসকারী এসব স্বজন বন্যার পর থেকে নিখোঁজ। তুলমায়া বলেন, ‘আমাদের পরিবার প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এত মানুষ হারিয়ে গেছে, আর যারা বেঁচে আছি, তারাও কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’ স্বজনদের জীবিত থাকার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসায় এখন অন্তত মরদেহগুলো উদ্ধারের প্রত্যাশা করছেন তারা। তুলমায়া বলেন, ‘মরদেহগুলো যদি পাওয়া যেত, তাহলে অন্তত আমরা কিছুটা শান্তি পেতাম। তা না হলে পরিবার কখনোই ভাবা বন্ধ করতে পারবে না কী হয়েছিল। এই কষ্ট অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকবে।’

 

নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৯০০ জন ত্রিশুলি নদী করিডোরের বিস্তীর্ণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে কাজ করতেন। হিমালয়ের উঁচু এলাকায় অবস্থিত এসব প্রকল্প বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজ শ্রমিকদের অনেকেই স্বল্প বেতনের শ্রমিক। তাদের মধ্যে অন্তত ৬৩ জন ভারতের নাগরিক। শুক্রবার প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেল থেকে ঘন কাদার স্তর ভেদ করে কয়েকজন জীবিত ব্যক্তিকে টেনে বের করছেন নেপালি সেনারা।

 

নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ওই টানেলের ভেতর আরও অন্তত ১০০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন। এ ছাড়া ত্রিশুলি-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ অংশেও কয়েক ডজন মানুষ আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের একজন ২৪ বছর বয়সী সুজন নেপালি। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে রাতের শিফট শেষ করে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। তখনই উপত্যকা দিয়ে প্রবল পানির স্রোত নেমে আসে। নেপালের একটি হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে সুজনের বোন সুশিশা মালুয়ার প্রতিদিন উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছেন। হাসপাতালের তালিকায় ভাইয়ের নাম আছে কি না, তা দেখতে তিনি প্রতিদিন ফিরে আসছেন। সুশিশা বলেন, ‘আমরা আশা হারাইনি। হাসপাতালগুলোতে তার নাম লিখে রাখছি এবং সর্বত্র তার ছবি লাগাচ্ছি—এই আশায় যে কোথাও না কোথাও হয়তো তাকে খুঁজে পাব। হয়তো তাঁকে ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। হয়তো তিনি কোনোভাবে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে আছেন।’

 

নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে দুর্গম এলাকা, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারীদের সামনে প্রতিনিয়তই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। আর হাসপাতালের দেয়ালে ঝুলতে থাকা প্রতিটি পোস্টার যেন নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার শেষ আশাটুকুই ধরে রেখেছে।

 

সূত্র: গার্ডিয়ান