এবার ইরান যুদ্ধে অস্ত্রের ঘাটতির গোপন তথ্য ফাঁসের সন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রায় ৫০ কর্মকর্তাকে ‘লাই ডিটেক্টর’ বা মিথ্যা শনাক্তকারী ‘পলিগ্রাফ’ পরীক্ষা দিতে হয়েছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তথ্যফাঁসকারী খুঁজে বের করতে সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট স্টাফের এসব কর্মকর্তাকে পলিগ্রাফ পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একসঙ্গে এমন পরীক্ষার মুখোমুখি করার ঘটনা নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা। মূলত কারা তথ্য ফাঁস করেছে তা খুঁজে বের করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান—এমন ব্যক্তিদের ভয় দেখানোও এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। স্থানীয় সময় গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয়েন্ট স্টাফের প্রায় ৫০ জন কর্মীকে পলিগ্রাফ পরীক্ষা দিতে হয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তাদের এই পরীক্ষা নেয়া হয়।
জয়েন্ট স্টাফ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এমন একটি সংস্থা, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে অভিযান সমন্বয় করে থাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘বিপুল’ পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে। এছাড়া গত মাসে সাংবাদিকদের কাছে ‘রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বক্তব্য’ দেয়ার অভিযোগে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়ার হুমকিও দেন। সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, এই তদন্ত নজিরবিহীন। কারণ এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একসঙ্গে পলিগ্রাফ পরীক্ষা দিতে হয়নি। ‘লাই ডিটেক্টর’ বা পলিগ্রাফ পরীক্ষা সাধারণভাবে মিথ্যা শনাক্তকারী পরীক্ষা নামে পরিচিত। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশ্ন করার সময় একজন ব্যক্তির শারীরিক প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করা হয়। এর মধ্যে হৃদস্পন্দন, শ্বাস–প্রশ্বাস ও রক্তচাপের পরিবর্তনও রয়েছে।
মূলত লাই ডিটেক্টর বা পলিগ্রাফ হলো এমন একটি যন্ত্র যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সত্য বলছেন নাকি মিথ্যা বলছেন তা যাচাই করার চেষ্টা করা হয়। তবে এই যন্ত্রটি সরাসরি কোনো মানুষের কথা বা চিন্তা ধরতে পারে না। এটি মূলত মিথ্যা বলার সময় মানুষের শরীরে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ এবং শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনগুলো রেকর্ড করে। সাধারণত একজন মানুষ যখন মিথ্যা বলে, তখন তার অজান্তেই শরীরে কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা যন্ত্রটি গ্রাফের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে। আমেরিকান পলিগ্রাফ অ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব পরীক্ষায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রতারণা বা মিথ্যা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সাধারণত পলিগ্রাফ পরীক্ষার ফল গ্রহণযোগ্য নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বিভিন্ন বিভাগ কিছু চাকরির ক্ষেত্রে যাচাই–বাছাইয়ের সময় এই পরীক্ষা ব্যবহার করে। আর ব্রিটেনে কিছু উচ্চঝুঁকির অপরাধীকে প্রবেশন চলাকালে এই পরীক্ষা দিতে হয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের এই পরীক্ষা আগস্টে নেয়া হয়। এর আগে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের দূরপাল্লার নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্রের ‘প্রায় সবই’ ব্যবহার করে ফেলেছে। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বলেও খবর প্রকাশিত হয়। ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল, হেগসেথ তাকে অস্ত্রের ঘাটতি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছিলেন। পরীক্ষার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কারা তথ্য ফাঁস করেছে তা খুঁজে বের করাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তদন্তের উদ্দেশ্য ছিল না। ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার কথা ভাবছেন—এমন অন্যদের ভয় দেখানোও এর একটি উদ্দেশ্য ছিল। সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, পলিগ্রাফ পরীক্ষা দিতে বাধ্য হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের সঙ্গে কাজ করতেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এই কমান্ড।
গত ২ আগস্ট ইরানের বিরুদ্ধে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় হামলা’ চালানোর পরিকল্পনা বাতিলের পেছনে অস্ত্রের ঘাটতি ভূমিকা রেখেছিল—এমন সংবাদ প্রকাশের পর ট্রাম্প ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। এর চার দিন পর নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে, বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্র। এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরি ও যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কারখানা ও উৎপাদনকেন্দ্র তৈরি করছে’।
সেসময় তিনি আরও বলেন, ‘এই রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বক্তব্য দেয়া ‘তথ্য ফাঁসকারীদের’ খুঁজে বের করা হচ্ছে। তাদের দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়ার চেষ্টা করা হবে!’ তবে কোন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে তিনি ইঙ্গিত করে এসব কথা বলেছেন, তা স্পষ্ট করেননি ট্রাম্প। মূলত যুদ্ধ নিয়ে সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশকারী হুইসেলব্লোয়ারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি তার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দিয়ে আসছেন। গত বছর থেকে পিট হেগসেথের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষের খবর ফাঁস হওয়ার ঘটনাতেও পেন্টাগন বেশ কয়েকটি তদন্ত চালিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসকে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব তথ্য ফাঁসের ঘটনা হেগসেথের তৈরি করা অবিশ্বাসের পরিবেশকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, হেগসেথ তার চারপাশে অনুগত ব্যক্তিদের রেখেছেন এবং দায়িত্ব নেয়ার পর সামরিক বাহিনী থেকে ৮০ জনের বেশি জেনারেল ও অ্যাডমিরালকে সরিয়ে দিয়েছেন। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ কর্মী বা তদন্তসংক্রান্ত বিষয়ে পেন্টাগন মন্তব্য করে না। তবে জাতীয় নিরাপত্তার গোপন তথ্য ফাঁসের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং সে অনুযায়ী তদন্ত করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘গোপন তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মোতায়েন থাকা আমাদের সেনাদের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

ডেস্ক রিপোর্ট 























