চলতি বছরের ৮ অক্টোবর থেকে বঙ্গোপসাগরে মা ইলিশ সংরক্ষণে বাংলাদেশের জলসীমায় শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। তবে ভারতের জলসীমায় একই সময়ে এমন কোনো বিধিনিষেধ না থাকায় নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলেদের মধ্যে। বাংলাদেশি জেলেরা যখন সাগরে যেতে না পেরে কর্মহীন হয়ে কষ্টে দিন কাটাবেন, তখন ভারতীয় জেলেরা নির্বিঘ্নে মাছ ধরবেন এমন পরিস্থিতিকে এক সমুদ্রে দুই নিয়ম হিসেবে দেখছেন জেলেরা।
শুধু নিষেধাজ্ঞাই নয়, বছরের বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক জেলে পরিবার। নিষেধাজ্ঞার সময়ে সাগরে নজরদারি কতটা কার্যকর, অবৈধভাবে মাছ ধরা কতটা বন্ধ করা যাচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রকৃত জেলেরা কতটা লাভবান হচ্ছেন এসব নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
বারবার নিষেধাজ্ঞা, সংকটে জেলেরা
বাংলাদেশে এক বছরে জেলেদের জন্য একাধিক দফায় মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সামুদ্রিক মাছের প্রজনন রক্ষায় ৫৮ দিন, অক্টোবর মাসে মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিন, তেঁতুলিয়া নদীর অভয়াশ্রমে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস এবং ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরায় আট মাস নিষেধাজ্ঞা থাকে। এর বাইরে ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ, কালবৈশাখীসহ আবহাওয়াজনিত প্রতিকূলতা তো আছেই।
সব মিলিয়ে পটুয়াখালীর উপকূলে বছরের বড় একটি সময় কোনো না কোনো কারণে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। শুধু মাছ ধরা নয়, এসব সময়ে মাছ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও মজুতও নিষিদ্ধ থাকে। ফলে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়।
রাঙ্গাবালীতেই জেলে প্রায় ২২ হাজার
পটুয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীতেও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়ে সরাসরি জেলে পরিবারগুলোর ওপর। উপজেলা পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, রাঙ্গাবালীতে জেলের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত জেলের সংখ্যা ১৬ হাজার ৮০৯ জন।
তবে আসন্ন ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় রাঙ্গাবালী উপজেলায় ১২ হাজার ৫০০ জেলের জন্য ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ রয়েছে। ফলে তালিকাভুক্ত ১৬ হাজার ৮০৯ জন জেলের মধ্যেও একটি বড় অংশ সরকারি খাদ্য সহায়তার বাইরে থাকছেন।
জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময়ে শুধু চাল বরাদ্দ করলেই তাদের সংকট কাটবে না। কারণ সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও নৌকা ও জালের খরচ, দাদনের টাকা এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ বন্ধ থাকে না। তাই খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
এক সমুদ্রে দুই নিয়ম নিয়ে ক্ষোভ
জেলেদের অভিযোগ, একই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অংশে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও ভারতের অংশে মাছ ধরা চালু থাকে। এ সুযোগে ভারতীয় জেলেরা আধুনিক ট্রলার নিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ শিকার করলে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
জেলেরা বলছেন, একদিকে তারা সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে নৌকা ঘাটে তুলে রাখেন, অন্যদিকে যদি অন্য দেশের জেলেরা নির্বিঘ্নে মাছ ধরতে পারেন, তাহলে তাদের জন্য নিষেধাজ্ঞার চাপ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে রয়েছে দাদন ও এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ। বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নৌকা, জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক পরিবারকে নতুন করে ঋণ নিতে হয়। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় আয় বন্ধ হয়ে গেলে ঋণের বোঝা আরও বাড়ে।
গবেষকদের মতামত
বিশ্বের মোট ইলিশের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের জলসীমায় উৎপাদিত হয়। গত ১০ বছরের ব্যবধানে দেশের ইলিশ উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২ অক্টোবর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ দিনের নিষেধাজ্ঞা পালন করে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। ফলে একই বঙ্গোপসাগরে মাছ সংরক্ষণে দুই দেশের নিষেধাজ্ঞার সময়ের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন উপকূলের জেলেরা।
নজরদারিতে নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে প্রতিবছরের মতো এবারও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও মৎস্য বিভাগ। অবৈধভাবে মাছ ধরতে নামা ঠেকাতে উপকূল ও সাগরে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তবে জেলেদের দাবি, শুধু দেশের জলসীমায় অভিযান চালালেই হবে না, নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়ে সাগরে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের জলসীমায় অন্য দেশের জেলেদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতেও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্য
পটুয়াখালীতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে জেলের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এর মধ্যে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের শুধু চাল-ডাল নয়, বিকল্প কর্মসংস্থানমূলক কাজসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার দাবি রয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, এক সমুদ্রে দুই নিয়ম’ নিয়ে জেলেদের মধ্যে অনেক ক্ষোভ রয়েছে। বিষয়গুলো সরকারি দপ্তরে উপস্থাপন করা হবে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রচার প্রচারণা চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই খেটে খাওয়া জেলেদের মাঝে ২৫ কেজি করে চাল বিতরণ করা হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেরা যাতে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা সফল হলে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত জেলেদেরই উপকার করবে।
সাগর বাঁচাতে নিষেধাজ্ঞা, আর জেলেদের বাঁচাতে কার্যকর সহায়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই এখন উপকূলের মানুষের প্রধান দাবি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জলসীমায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রেখে পার্শ্ববর্তী দেশের জলসীমায় মাছ ধরার বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

মোঃনয়ন ইসলাম মানজার রাঙ্গাবালী পটুয়াখালী প্রতিনিধি 















