ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট কার্যালয়ে ছাত্রদল কর্তৃক ছাত্রশিবির ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দের ওপর হামলার অভিযোগে জড়িতদের বিচার, নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রশাসনের জবাবদিহি এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। একই ঘটনায় পৃথক বিবৃতিতে শহীদুল্লাহ হল সংসদও হামলার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে তিন দফা দাবি জানিয়েছে।
শনিবার (০২ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মধুর ক্যান্টিন থেকে ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে প্রতিবাদ মিছিলটি বের হয়। পরে সমাবেশে নেতারা বক্তব্য দেন।
বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মহিউদ্দিন খান অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অতীতে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালে নিজ দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর নজির থাকলেও বর্তমান প্রশাসন তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এর আগেও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় হামলা, শহীদুল্লাহ হলসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার বিচার চেয়ে তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে এলেও প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। তার দাবি, সারা দেশেই সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির নানা ঘটনায় ছাত্রদল ও বিএনপির নাম উঠে আসছে।’
মহিউদ্দিন খান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘হামলা-সহিংসতা অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীরা আবারও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হবে, যেমনটি জুলাই আন্দোলনে হয়েছিল।’
বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল নতুন করে গেস্টরুম ও ‘টর্চার সেল’ সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং শিক্ষার্থীদের এসব অপসংস্কৃতি প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান তিনি।
মহিউদ্দিন খান বলেন, ‘ছাত্রদল যদি মনে করে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সহিংসতা চালিয়েও পার পেয়ে যাবে, তবে সেটি ভুল ধারণা। একসময় ছাত্রলীগ যেভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, প্রয়োজন হলে ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হতে পারে।’
ঢাবি শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হুসাইন বলেন, ‘তারা আগেও দেখেছেন ছাত্রদল শাহবাগ থানায় মব সৃষ্টি করে হামলা করেছে। বাংলাদেশের কোথাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা চাঁদাবাজি হলে সেখানে ছাত্রদলের নাম না থাকা এখন বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রদল প্রভোস্টের কক্ষে ঢুকে হামলা চালিয়েছে। প্রভোস্টের উচিত ছিল হামলার বিচার করা। কিন্তু তিনি ছাত্রদলের লোক হওয়ায় কিছু বলতে পারেননি এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন। একই কারণে প্রক্টর ও উপাচার্যেরও পদত্যাগ করা উচিত। ছাত্রদলের নেতারাই সাংবাদিকদের সামনে শাহবাগ থানায় হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন তাদের বিচার নিশ্চিত করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রদলের লেজুড়বৃত্তি করছে।’
এদিকে, শহীদুল্লাহ হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) তাওকির হাসান বলেন, ‘হলের এজিএসের কক্ষে অতিথিদের আসার ভিডিও পাঁচ দিন আগেই ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে হল প্রভোস্ট ছাত্রদলের চাপে পড়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ ছাড়াই এজিএসের সিট বাতিল করেন। এর ধারাবাহিকতায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রভোস্ট কার্যালয়ে প্রবেশ করে তাদের ওপর হামলা চালায়।’
একই ঘটনায় রোববার শহীদুল্লাহ হল সংসদের পক্ষ থেকে দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৭ জুলাই হল সংসদের এজিএসের কক্ষে অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থান-সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির আনুষ্ঠানিক সভা প্রভোস্ট কার্যালয়ে চলাকালে ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মী বেআইনিভাবে কক্ষে প্রবেশ করেন।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, প্রভোস্ট ভবনের বাইরে ছাত্রদলের বহিরাগত ও সংগঠিত অবস্থানের ভিডিও ধারণ করায় শিবিরকর্মী জায়েদ তালহাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং প্রভোস্ট কক্ষের এক কোণে ফেলে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয়।
এতে বলা হয়, চারজন হাউজ টিউটর ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রভোস্টের কক্ষে ঢুকে তাণ্ডব চালায় এবং হল সংসদের প্রতিনিধি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালায়। হামলার ভিডিও ধারণ করার কারণে হল সংসদের পাঠকক্ষ সম্পাদক খাদেমুল ইসলামের ওপরও প্রভোস্ট কক্ষেই পুনরায় হামলা চালানো হয়।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা) ও ডাকসুর নেতৃবৃন্দের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত জুনায়েদ আবরারের নেতৃত্বে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হল সংসদের জিএস তাওকির হাসানের ওপরও শারীরিক হামলা চালায়।
সহকারী প্রক্টর নূর আলম সিদ্দিকীর ভূমিকার সমালোচনা করে বিবৃতিতে বলা হয়, উপস্থিত শিক্ষকদের সামনেই হামলার ঘটনা ঘটলেও তিনি কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে বলেন, ‘রাগের মাথায় হামলা করে ফেলেছে’ এবং ‘আমরা নিজে থেকে কোনো স্টেপ নিতে পারব না।’ হল সংসদের দাবি, এ ধরনের বক্তব্য হামলাকারীদের আরও উৎসাহিত করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার দায় নিয়েই হলের প্রভোস্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















