দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে গত তিন বছরে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত ৪০২টি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে জামায়াতের সংসদ সদস্য রুহুল আমিনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, কারখানা বন্ধের কারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অবস্থান নিয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের পোশাকশিল্প একাধিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মতো পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পোশাকবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তিনি জানান, কারখানা বন্ধের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। করোনা মহামারির অভিঘাত, বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদেশি ক্রেতাদের রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়াও এর জন্য দায়ী।
বিজিএমইএর ২২ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধার ব্যবধানও পোশাকশিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে।
এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থার সুবিধার কারণে ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলোতে রপ্তানি আদেশ দিতে অনাগ্রহও পোশাকশিল্পে প্রভাব ফেলছে। ফলে বড় কারখানার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও অর্ডার সংকটে পড়ছেন।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। উন্নত দেশগুলোর ট্রেডিং স্কিমের আওতায় বর্তমানে পাওয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধার একটি বড় অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এতে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ সম্পন্ন হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ করার প্রক্রিয়াও চলছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইপিএ, সিইপিএ বা এফটিএ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য বাণিজ্য সুবিধা হারানোর প্রভাব কমিয়ে আনা। পাশাপাশি নতুন বাজার সৃষ্টি ও বিদ্যমান বাজারে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে ৪৪ হাজার ৫০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে চলতি বছরের জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৮৬ দশমিক ৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
একদিকে রপ্তানি আয়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারখানা বন্ধের প্রভাব উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানের ওপর পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোজ্যতেল ও পান রপ্তানির তথ্য
চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় সম্পূর্ণটাই আমদানিনির্ভর। প্রতিবছর দেশে প্রায় ২২ থেকে ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের প্রয়োজন হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও সরবরাহের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় পরিস্থিতির ওপরও দেশের ভোজ্যতেল বাজার অনেকাংশে নির্ভরশীল।
অন্যদিকে কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল গফুরের প্রশ্নের জবাবে কৃষিপণ্য রপ্তানির ইতিবাচক চিত্রও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২২ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পান রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশের পান লেবানন, ওমান, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























