ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
টানা দুদিন লোডশেডিংমুক্ত ছিল দেশ: বিদ্যুৎ বিভাগ জাতীয় সংসদে এসে উচ্ছ্বসিত বাউফলের ৫০ শিক্ষার্থী এবার হারিকেন জ্বালিয়ে আ.লীগ নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল ইরানের ইউরেনিয়াম ইস্যুতে পুতিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে চান: ট্রাম্প রিজওয়ানা এতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত মহিলা, শেখ হাসিনাও তার ধারেকাছে আসবেন না: সিনিয়র আইনজীবী ২ হাজার জাহাজসহ ২০ হাজার নাবিক আটকা, বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন সংকট রূপপুর প্রকল্প যার অবদান, তার জন্য দোয়া: তারেক রহমান ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান ট্রাম্পের, পাল্টা হুঁশিয়ারি আইআরজিসির ইনুকে ‘টেনশন না করতে বলা’ দুই কনস্টেবল শাস্তির আওতায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর আমিনুর শাহ গ্রেপ্তার

আইআরজিসির সামনে টিকতে পারবে মার্কিন সেনারা, ইতিহাস স্বাক্ষী: দি ইন্ডিপেন্ডেন্টের বিশ্লেষণ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৯:৫৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
  • ৬৭ বার পড়া হয়েছে

এবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে এক অদম্য ও প্রায়শই অবমূল্যায়িত শক্তি হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্য এবং আধাসামরিক বাহিনীবাসিজ’-এর আনুমানিক সাড়ে ৪ লাখ রিজার্ভ সদস্য নিয়ে গঠিত ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর এই বৃহত্তম অংশ দেশটির রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি বিমান হামলায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইআরজিসিকে দায়মুক্তির বিনিময়ে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান। আইআরজিসি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং গত এক মাসে তাদের আরও অনেক নেতা নিহত হলেও তারা পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। মার্কিন স্থল বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি বোঝা জরুরি যেএক মাসব্যাপী ব্যাপক মার্কিনইসরাইলি বোমাবর্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, অভ্যন্তরীণ বিভেদ এবং নেতৃত্ব হারানো সত্ত্বেওআইআরজিসি যেকোনো স্থল আগ্রাসনকে অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রতিরোধ করবে। তাদের ইতিহাসই বলে দেয় কেন তারা এমনটা করবে।

আইআরজিসি মূলত ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিরইসলামি প্রজাতন্ত্রেরদর্শনে বিশ্বাসী ছাত্রদের নিয়ে গঠিত একটি অ্যাডহক স্ট্রিট মিলিশিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর যারা ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র গড়তে চেয়েছিল, আইআরজিসি তাদের বিরোধী ছিল এবং নবজাতক ইসলামি বিপ্লবী সরকারকে রক্ষা করতে একটি ন্যাশনাল গার্ড হিসেবে কাজ করতে চেয়েছিল। পাসদারানএ ইনকিলাববাবিপ্লবের রক্ষকনামে পরিচিত এই বাহিনী দ্রুতই দেশটির সর্বোচ্চ নেতার একনিষ্ঠ বাহিনীতে পরিণত হয়। শুরুর দিনগুলোতে এটি শাহের আমলের সেনাবাহিনীআর্তেশ’-এর পাল্টা অভ্যুত্থান রুখে দিয়েছিল। আইআরজিসি ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামি মিলিশিয়াদের মতো অন্যান্য বিপ্লবী গোষ্ঠীর সঙ্গেও রাজপথে লড়াই করেছে। ১৯৮০ সালে ইরাকের ইরান আক্রমণের সময় আইআরজিসি জাতীয় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি একটি সম্মুখ সারির প্রচলিত যুদ্ধ বাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয়।

১৯৮২ সালের মধ্যে তারা সাদ্দাম হোসেনের আক্রমণ প্রতিহত করে, যদিও যুদ্ধ আরও ৬ বছর চলেছিল। আইআরজিসির বর্তমান অনেক কমান্ডার তখন তরুণ সৈনিক বা অফিসার ছিলেন এবং তারা প্রত্যক্ষ করেছেন কীভাবে পশ্চিমারা নীরব থাকার সুযোগে ইরাক তাদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। ১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেন যখন ইরানের কুর্দি বিদ্রোহীদের সমর্থন দেন, তখন আইআরজিসি একটি বিদ্রোহ দমনকারী বাহিনী হিসেবেও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। ১৯৮০র দশকে উত্তরপশ্চিমে কুর্দি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ২০০০এর দশকে দক্ষিণপূর্বের বালুচ বিদ্রোহসব ধরনের অভ্যন্তরীণ জাতিগত বিদ্রোহ তারা কঠোরভাবে দমন করেছে। ফলে, কুর্দি বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা আইআরজিসি কমান্ডারদের প্রচণ্ড ক্রোধের মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যারা কয়েক দশক ধরে এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। আঞ্চলিক প্রক্সি বা ছায়াবাহিনীগুলোর মাধ্যমে আইআরজিসি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ীক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধেরব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

১৯৮২ সালে আইআরজিসি একটি বিশেষ বৈদেশিক বাহিনী গঠন করে, যাকুদস ফোর্সনামে পরিচিত। জেরুজালেমের আরবি নাম (আলকুদস) অনুসারে এর নামকরণ করা হয়। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থাকে (পিএলও) বিতাড়িত করতে সে বছর ইসরাইলি আক্রমণের প্রতিবাদে লেবাননে হিজবুল্লাহ গঠনে কুদস ফোর্স সহায়তা করেছিল। সেই সময় থেকে আইআরজিসি তাদের প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে ইসরাইলের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। ১৮ বছর ধরে হিজবুল্লাহ আত্মঘাতী গাড়ি বোমার মতো কৌশল ব্যবহার করে দখলদার ইসরাইলি বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তোলে, যারা শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই অভিযান ব্যাপকভাবে একটি সামরিক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। ২০০৩ সালে মার্কিন ইরাক আক্রমণের পর এই কৌশলগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটে, যখন কাতায়েব হিজবুল্লাহর মতো কুদসসমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো আইইডি (আইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) দিয়ে সেখানে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র একটিঅন্তহীন যুদ্ধথেকে নিজেকে মুক্ত করতে মরিয়া হয়ে ইরাক ত্যাগ করে।

লেবানন ও ইরাকের এই ছায়াবাহিনীগুলো থেকে পাওয়া শিক্ষা আইআরজিসি নিশ্চিতভাবে মার্কিন আগ্রাসনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার চেষ্টা করবে। এই কৌশলগুলোর অনেকগুলোই তৈরি করা হয়েছে দখলদার বাহিনীকে ধীরে ধীরে দুর্বল করার জন্য, যা হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো উচ্চতীব্রতার স্থল আক্রমণ ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট নয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি তার লক্ষ্য অর্জনে (যা বর্তমানে অস্পষ্ট) ব্যর্থ হয়, তবে তারা আবার একটি দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্ব এবং নিম্নতীব্রতার যুদ্ধের কবলে পড়তে পারে। আর তেমনটি হলে, আইআরজিসি তাদের সুনিপুণক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করবে। কয়েক দশকের দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার পর, ২০০১ সালের ৯/১১ হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে একটি সংক্ষিপ্ত জোটে বাধ্য করেছিল। ইরানের তৎকালীন সরকার ২০০১ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় ইরানি ভূখণ্ডে অবতরণ করা দুর্ঘটনাকবলিত মার্কিন পাইলটদের সহায়তার প্রস্তাব দেয়।

কিন্তু ২০০২ সালের জানুয়ারিতে জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ইরাক ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কুখ্যাতঅশুভ অক্ষবাঅ্যাক্সিস অব ইভিল’-এর অন্তর্ভুক্ত করেন এবং মার্কিনসন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধেতাদের লক্ষ্যবস্তু বানান। ইরানের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জনধারণায় একটি আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।এর ফলে সংস্কারবাদী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির সমঝোতার প্রচেষ্টা শেষ হয়ে যায়। তিন বছর পর, ইরান সরকার কট্টরপন্থী মাহমুদ আহমাদিনেজাদের উত্থানকে সমর্থন করে, যিনি সর্বোচ্চ নেতার পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আইআরজিসির বিস্তারে ব্যাপক বিনিয়োগ করেন। এরপর থেকে আইআরজিসি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের একাধিক নিরাপত্তা কার্যাবলি পরিচালনার জন্য বিবর্তিত হয়েছে।পরবর্তীতে আইআরজিসি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ডিটেন্টে বা উত্তেজনার প্রশমন ঘটেছিল কেবল ২০১৪ সালে, যখন কুদস ফোর্স ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান সহায়তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে লড়াই করেছিল। ওবামা প্রশাসনের সময় এই সহযোগিতা ঘটেছিল এবং এর এক বছর পরেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যা থেকে ২০১৭ সালে ট্রাম্প নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে যখন আইআরজিসি ঘাঁটিতে আইএসএর সন্ত্রাসী হামলা হয়, তখন তারা একে মার্কিন গোপন তৎপরতার ফলাফল হিসেবে গণ্য করে। এর জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করার পাশাপাশি বালুচ ও কুর্দি বিদ্রোহের উত্থানকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। আইআরজিসির বয়ান অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান যুদ্ধ হলো ১৯৮০র দশক থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করার লক্ষ্যে প্রক্সি বা অর্থনৈতিক যুদ্ধের মাধ্যমে আইআরজিসিকে আক্রমণ করার একটি পদ্ধতিগত মার্কিন প্রচেষ্টার অংশ। তাদের কাছে এটি এমন এক সংঘাত যা ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকেই চলে আসছে। বিগত এক মাসের মার্কিনইসরাইলি বিমান হামলায় আইআরজিসি নিঃসন্দেহে দুর্বল হয়েছে, কিন্তু এর ইতিহাস বলে যে, এর কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়বোধ রয়েছে এবং তাদের নেতৃত্ব নিহত হলেও তারা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা রক্ষায় সচেষ্ট থাকবে।

এটিই ব্যাখ্যা করে কেন খামেনির মৃত্যুর পর আইআরজিসি তাদের ক্ষমতা অটুট রাখতে তার ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। খামেনির মৃত্যুতে কিছু ইরানি আনন্দ প্রকাশ করলেও এবং অধিকাংশ শোক পালন করলেও, আইআরজিসি তার সরকারকে সমর্থন দিতে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট প্রদর্শন করেছে। যদি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে আইআরজিসি তার অভ্যন্তরীণ মর্যাদা হারাবে। আইআরজিসি একটি ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক হিসেবেও নিজেকে গড়ে তুলেছে। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে নির্মাণ খাত পর্যন্ত বিভিন্ন সেবামূলক খাতে তাদের মালিকানা রয়েছে এবং তারা অর্থনীতির অন্তত ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ সুবিধার এই নেটওয়ার্কটি মূলত একটিডিপ স্টেটবা রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে। আইআরজিসি কেবল একটি সেনাবাহিনী নয়, বরং একটি পৃথক, স্বায়ত্তশাসিত ও বিশাল সামরিক প্রতিষ্ঠান, যা খামেনির হত্যাকাণ্ডের পরও নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইতিহাসের ঘটনাবলি এবং বর্তমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি যদি কোনো ইঙ্গিত দেয়, তবে তা হলোতারা আত্মসমর্পণ করার চেয়ে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

টানা দুদিন লোডশেডিংমুক্ত ছিল দেশ: বিদ্যুৎ বিভাগ

আইআরজিসির সামনে টিকতে পারবে মার্কিন সেনারা, ইতিহাস স্বাক্ষী: দি ইন্ডিপেন্ডেন্টের বিশ্লেষণ

আপডেট সময় ০৯:৫৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬

এবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে এক অদম্য ও প্রায়শই অবমূল্যায়িত শক্তি হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্য এবং আধাসামরিক বাহিনীবাসিজ’-এর আনুমানিক সাড়ে ৪ লাখ রিজার্ভ সদস্য নিয়ে গঠিত ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর এই বৃহত্তম অংশ দেশটির রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি বিমান হামলায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইআরজিসিকে দায়মুক্তির বিনিময়ে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান। আইআরজিসি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং গত এক মাসে তাদের আরও অনেক নেতা নিহত হলেও তারা পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। মার্কিন স্থল বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি বোঝা জরুরি যেএক মাসব্যাপী ব্যাপক মার্কিনইসরাইলি বোমাবর্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, অভ্যন্তরীণ বিভেদ এবং নেতৃত্ব হারানো সত্ত্বেওআইআরজিসি যেকোনো স্থল আগ্রাসনকে অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রতিরোধ করবে। তাদের ইতিহাসই বলে দেয় কেন তারা এমনটা করবে।

আইআরজিসি মূলত ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিরইসলামি প্রজাতন্ত্রেরদর্শনে বিশ্বাসী ছাত্রদের নিয়ে গঠিত একটি অ্যাডহক স্ট্রিট মিলিশিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর যারা ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র গড়তে চেয়েছিল, আইআরজিসি তাদের বিরোধী ছিল এবং নবজাতক ইসলামি বিপ্লবী সরকারকে রক্ষা করতে একটি ন্যাশনাল গার্ড হিসেবে কাজ করতে চেয়েছিল। পাসদারানএ ইনকিলাববাবিপ্লবের রক্ষকনামে পরিচিত এই বাহিনী দ্রুতই দেশটির সর্বোচ্চ নেতার একনিষ্ঠ বাহিনীতে পরিণত হয়। শুরুর দিনগুলোতে এটি শাহের আমলের সেনাবাহিনীআর্তেশ’-এর পাল্টা অভ্যুত্থান রুখে দিয়েছিল। আইআরজিসি ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামি মিলিশিয়াদের মতো অন্যান্য বিপ্লবী গোষ্ঠীর সঙ্গেও রাজপথে লড়াই করেছে। ১৯৮০ সালে ইরাকের ইরান আক্রমণের সময় আইআরজিসি জাতীয় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি একটি সম্মুখ সারির প্রচলিত যুদ্ধ বাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয়।

১৯৮২ সালের মধ্যে তারা সাদ্দাম হোসেনের আক্রমণ প্রতিহত করে, যদিও যুদ্ধ আরও ৬ বছর চলেছিল। আইআরজিসির বর্তমান অনেক কমান্ডার তখন তরুণ সৈনিক বা অফিসার ছিলেন এবং তারা প্রত্যক্ষ করেছেন কীভাবে পশ্চিমারা নীরব থাকার সুযোগে ইরাক তাদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। ১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেন যখন ইরানের কুর্দি বিদ্রোহীদের সমর্থন দেন, তখন আইআরজিসি একটি বিদ্রোহ দমনকারী বাহিনী হিসেবেও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। ১৯৮০র দশকে উত্তরপশ্চিমে কুর্দি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ২০০০এর দশকে দক্ষিণপূর্বের বালুচ বিদ্রোহসব ধরনের অভ্যন্তরীণ জাতিগত বিদ্রোহ তারা কঠোরভাবে দমন করেছে। ফলে, কুর্দি বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা আইআরজিসি কমান্ডারদের প্রচণ্ড ক্রোধের মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যারা কয়েক দশক ধরে এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। আঞ্চলিক প্রক্সি বা ছায়াবাহিনীগুলোর মাধ্যমে আইআরজিসি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ীক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধেরব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

১৯৮২ সালে আইআরজিসি একটি বিশেষ বৈদেশিক বাহিনী গঠন করে, যাকুদস ফোর্সনামে পরিচিত। জেরুজালেমের আরবি নাম (আলকুদস) অনুসারে এর নামকরণ করা হয়। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থাকে (পিএলও) বিতাড়িত করতে সে বছর ইসরাইলি আক্রমণের প্রতিবাদে লেবাননে হিজবুল্লাহ গঠনে কুদস ফোর্স সহায়তা করেছিল। সেই সময় থেকে আইআরজিসি তাদের প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে ইসরাইলের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। ১৮ বছর ধরে হিজবুল্লাহ আত্মঘাতী গাড়ি বোমার মতো কৌশল ব্যবহার করে দখলদার ইসরাইলি বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তোলে, যারা শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই অভিযান ব্যাপকভাবে একটি সামরিক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। ২০০৩ সালে মার্কিন ইরাক আক্রমণের পর এই কৌশলগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটে, যখন কাতায়েব হিজবুল্লাহর মতো কুদসসমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো আইইডি (আইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) দিয়ে সেখানে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র একটিঅন্তহীন যুদ্ধথেকে নিজেকে মুক্ত করতে মরিয়া হয়ে ইরাক ত্যাগ করে।

লেবানন ও ইরাকের এই ছায়াবাহিনীগুলো থেকে পাওয়া শিক্ষা আইআরজিসি নিশ্চিতভাবে মার্কিন আগ্রাসনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার চেষ্টা করবে। এই কৌশলগুলোর অনেকগুলোই তৈরি করা হয়েছে দখলদার বাহিনীকে ধীরে ধীরে দুর্বল করার জন্য, যা হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো উচ্চতীব্রতার স্থল আক্রমণ ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট নয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি তার লক্ষ্য অর্জনে (যা বর্তমানে অস্পষ্ট) ব্যর্থ হয়, তবে তারা আবার একটি দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্ব এবং নিম্নতীব্রতার যুদ্ধের কবলে পড়তে পারে। আর তেমনটি হলে, আইআরজিসি তাদের সুনিপুণক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করবে। কয়েক দশকের দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার পর, ২০০১ সালের ৯/১১ হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে একটি সংক্ষিপ্ত জোটে বাধ্য করেছিল। ইরানের তৎকালীন সরকার ২০০১ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় ইরানি ভূখণ্ডে অবতরণ করা দুর্ঘটনাকবলিত মার্কিন পাইলটদের সহায়তার প্রস্তাব দেয়।

কিন্তু ২০০২ সালের জানুয়ারিতে জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ইরাক ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কুখ্যাতঅশুভ অক্ষবাঅ্যাক্সিস অব ইভিল’-এর অন্তর্ভুক্ত করেন এবং মার্কিনসন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধেতাদের লক্ষ্যবস্তু বানান। ইরানের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জনধারণায় একটি আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।এর ফলে সংস্কারবাদী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির সমঝোতার প্রচেষ্টা শেষ হয়ে যায়। তিন বছর পর, ইরান সরকার কট্টরপন্থী মাহমুদ আহমাদিনেজাদের উত্থানকে সমর্থন করে, যিনি সর্বোচ্চ নেতার পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আইআরজিসির বিস্তারে ব্যাপক বিনিয়োগ করেন। এরপর থেকে আইআরজিসি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের একাধিক নিরাপত্তা কার্যাবলি পরিচালনার জন্য বিবর্তিত হয়েছে।পরবর্তীতে আইআরজিসি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ডিটেন্টে বা উত্তেজনার প্রশমন ঘটেছিল কেবল ২০১৪ সালে, যখন কুদস ফোর্স ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান সহায়তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে লড়াই করেছিল। ওবামা প্রশাসনের সময় এই সহযোগিতা ঘটেছিল এবং এর এক বছর পরেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যা থেকে ২০১৭ সালে ট্রাম্প নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে যখন আইআরজিসি ঘাঁটিতে আইএসএর সন্ত্রাসী হামলা হয়, তখন তারা একে মার্কিন গোপন তৎপরতার ফলাফল হিসেবে গণ্য করে। এর জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করার পাশাপাশি বালুচ ও কুর্দি বিদ্রোহের উত্থানকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। আইআরজিসির বয়ান অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান যুদ্ধ হলো ১৯৮০র দশক থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করার লক্ষ্যে প্রক্সি বা অর্থনৈতিক যুদ্ধের মাধ্যমে আইআরজিসিকে আক্রমণ করার একটি পদ্ধতিগত মার্কিন প্রচেষ্টার অংশ। তাদের কাছে এটি এমন এক সংঘাত যা ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকেই চলে আসছে। বিগত এক মাসের মার্কিনইসরাইলি বিমান হামলায় আইআরজিসি নিঃসন্দেহে দুর্বল হয়েছে, কিন্তু এর ইতিহাস বলে যে, এর কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়বোধ রয়েছে এবং তাদের নেতৃত্ব নিহত হলেও তারা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা রক্ষায় সচেষ্ট থাকবে।

এটিই ব্যাখ্যা করে কেন খামেনির মৃত্যুর পর আইআরজিসি তাদের ক্ষমতা অটুট রাখতে তার ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। খামেনির মৃত্যুতে কিছু ইরানি আনন্দ প্রকাশ করলেও এবং অধিকাংশ শোক পালন করলেও, আইআরজিসি তার সরকারকে সমর্থন দিতে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট প্রদর্শন করেছে। যদি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে আইআরজিসি তার অভ্যন্তরীণ মর্যাদা হারাবে। আইআরজিসি একটি ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক হিসেবেও নিজেকে গড়ে তুলেছে। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে নির্মাণ খাত পর্যন্ত বিভিন্ন সেবামূলক খাতে তাদের মালিকানা রয়েছে এবং তারা অর্থনীতির অন্তত ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ সুবিধার এই নেটওয়ার্কটি মূলত একটিডিপ স্টেটবা রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে। আইআরজিসি কেবল একটি সেনাবাহিনী নয়, বরং একটি পৃথক, স্বায়ত্তশাসিত ও বিশাল সামরিক প্রতিষ্ঠান, যা খামেনির হত্যাকাণ্ডের পরও নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইতিহাসের ঘটনাবলি এবং বর্তমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি যদি কোনো ইঙ্গিত দেয়, তবে তা হলোতারা আত্মসমর্পণ করার চেয়ে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।