ঢাকা , শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে আসছে তুরস্কের আইভিএফ হাসপাতাল: বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় যুগান্তকারী উদ্যোগ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৮:৩৬:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫
  • ৮৬১ বার পড়া হয়েছে

বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় বাংলাদেশে সরকারিভাবে এখনো কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। যদিও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ২৫টিরও বেশি সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি (আইভিএফ) সেন্টার গড়ে উঠেছে এবং তাতে সফলতাও মিলছে, তবুও অনেক দম্পতি চিকিৎসার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারত কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কে যাচ্ছেন। এতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় প্রথমবারের মতো আইভিএফ হাসপাতাল স্থাপন করতে যাচ্ছে তুরস্কের ওকান ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করবে তুরস্ক সরকারের অনুমোদিত একমাত্র মেডিকেল ট্যুরিজম কোম্পানি টার্কিশডক। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের শেষের দিকে হাসপাতালটি চালু হবে বলে জানা গেছে।

টার্কিশডক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই হাসপাতালটি নির্মিত হবে। চালুর প্রথম দুই বছর তুরস্কের অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করবেন এবং তাদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেবেন। পরবর্তীতে হাসপাতালটি পুরোপুরি দেশীয় চিকিৎসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ১৭.৫ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যত্বে ভুগছেন, আর নিম্ন ও মধ্যআয়ের দেশগুলোতে এ হার ১৬.৫ শতাংশ। বাংলাদেশেও এই সমস্যায় বিপুল সংখ্যক দম্পতি ভুগলেও সরকারি পরিসংখ্যান নেই।

ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টারিলিটি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম বলেন, “নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে বন্ধ্যত্বে ভোগা দম্পতিদের এক-তৃতীয়াংশ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান।”

প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি রোগী বিদেশে যান চিকিৎসার জন্য, যার বড় অংশই বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারত ও সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন। সেখানে আইভিএফ চিকিৎসায় খরচ হয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। তুলনামূলকভাবে তুরস্কে একই চিকিৎসা পাওয়া যায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায়।

টার্কিশডকের কান্ট্রি হেড এম নুরুজ্জামান রাজু বলেন, “বাংলাদেশে আইভিএফ সেন্টার আছে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশের ভেতরেই উন্নত মানের আইভিএফ হাসপাতাল স্থাপন করা গেলে রোগীরা উপকৃত হবেন, অর্থও দেশে থাকবে।”

তিনি জানান, তুরস্কের দুটি বেসরকারি কোম্পানি হাসপাতালটি করতে আগ্রহী এবং নীতিগতভাবে অনুমোদনও দিয়েছে। ভবিষ্যতে হাসপাতালটিতে বোনম্যারো ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সুবিধাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

টার্কিশডকের প্রধান নির্বাহী ফাইক গকসু বলেন, “তুরস্ক এখন বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবায় অন্যতম শীর্ষ দেশ। আমরা বাংলাদেশে এমন একটি হাসপাতাল করতে চাই, যা নৈতিক, ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য এবং বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত। আমাদের আইভিএফ প্রোটোকলে সফলতার হার ৭০ শতাংশের বেশি।”

তিনি আরও জানান, নতুন প্রকল্পটি শুধু একটি হাসপাতাল নয়, বরং একটি যৌথ রেফারেন্স সেন্টার—যেখানে তুর্কি ও বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করবেন। প্রথম ধাপে আইভিএফ, জেনেটিক স্ক্রিনিং ও নারীদের স্বাস্থ্যসেবা শুরু হবে; দ্বিতীয় ধাপে লিভার, কিডনি ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রোগ্রাম চালু হবে।

ফাইক গকসু বলেন, “বাংলাদেশে অবকাঠামো ভালো হলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও বিশেষজ্ঞ জনবলের ঘাটতি আছে। আমরা তুর্কি মেডিকেল প্রযুক্তি, রিমোট ডায়াগনোসিস, সেকেন্ড ওপিনিয়ন সিস্টেম এবং যৌথ সার্জারি প্রশিক্ষণ মডেল চালু করতে চাই। তুরস্কের বিশ্বস্বীকৃত ‘জিরো ইনফেকশন সার্জিক্যাল মডেল’ বাংলাদেশে প্রয়োগ করা হবে।”

বাংলাদেশে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় বিদেশনির্ভরতা কমবে, চিকিৎসকরা প্রশিক্ষিত হবেন এবং দেশের স্বাস্থ্যখাতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশে আসছে তুরস্কের আইভিএফ হাসপাতাল: বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় যুগান্তকারী উদ্যোগ

আপডেট সময় ০৮:৩৬:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫

বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় বাংলাদেশে সরকারিভাবে এখনো কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। যদিও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ২৫টিরও বেশি সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি (আইভিএফ) সেন্টার গড়ে উঠেছে এবং তাতে সফলতাও মিলছে, তবুও অনেক দম্পতি চিকিৎসার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারত কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কে যাচ্ছেন। এতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় প্রথমবারের মতো আইভিএফ হাসপাতাল স্থাপন করতে যাচ্ছে তুরস্কের ওকান ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করবে তুরস্ক সরকারের অনুমোদিত একমাত্র মেডিকেল ট্যুরিজম কোম্পানি টার্কিশডক। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের শেষের দিকে হাসপাতালটি চালু হবে বলে জানা গেছে।

টার্কিশডক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই হাসপাতালটি নির্মিত হবে। চালুর প্রথম দুই বছর তুরস্কের অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করবেন এবং তাদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেবেন। পরবর্তীতে হাসপাতালটি পুরোপুরি দেশীয় চিকিৎসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ১৭.৫ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যত্বে ভুগছেন, আর নিম্ন ও মধ্যআয়ের দেশগুলোতে এ হার ১৬.৫ শতাংশ। বাংলাদেশেও এই সমস্যায় বিপুল সংখ্যক দম্পতি ভুগলেও সরকারি পরিসংখ্যান নেই।

ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টারিলিটি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম বলেন, “নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে বন্ধ্যত্বে ভোগা দম্পতিদের এক-তৃতীয়াংশ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান।”

প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি রোগী বিদেশে যান চিকিৎসার জন্য, যার বড় অংশই বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারত ও সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন। সেখানে আইভিএফ চিকিৎসায় খরচ হয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। তুলনামূলকভাবে তুরস্কে একই চিকিৎসা পাওয়া যায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায়।

টার্কিশডকের কান্ট্রি হেড এম নুরুজ্জামান রাজু বলেন, “বাংলাদেশে আইভিএফ সেন্টার আছে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশের ভেতরেই উন্নত মানের আইভিএফ হাসপাতাল স্থাপন করা গেলে রোগীরা উপকৃত হবেন, অর্থও দেশে থাকবে।”

তিনি জানান, তুরস্কের দুটি বেসরকারি কোম্পানি হাসপাতালটি করতে আগ্রহী এবং নীতিগতভাবে অনুমোদনও দিয়েছে। ভবিষ্যতে হাসপাতালটিতে বোনম্যারো ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সুবিধাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

টার্কিশডকের প্রধান নির্বাহী ফাইক গকসু বলেন, “তুরস্ক এখন বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবায় অন্যতম শীর্ষ দেশ। আমরা বাংলাদেশে এমন একটি হাসপাতাল করতে চাই, যা নৈতিক, ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য এবং বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত। আমাদের আইভিএফ প্রোটোকলে সফলতার হার ৭০ শতাংশের বেশি।”

তিনি আরও জানান, নতুন প্রকল্পটি শুধু একটি হাসপাতাল নয়, বরং একটি যৌথ রেফারেন্স সেন্টার—যেখানে তুর্কি ও বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করবেন। প্রথম ধাপে আইভিএফ, জেনেটিক স্ক্রিনিং ও নারীদের স্বাস্থ্যসেবা শুরু হবে; দ্বিতীয় ধাপে লিভার, কিডনি ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রোগ্রাম চালু হবে।

ফাইক গকসু বলেন, “বাংলাদেশে অবকাঠামো ভালো হলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও বিশেষজ্ঞ জনবলের ঘাটতি আছে। আমরা তুর্কি মেডিকেল প্রযুক্তি, রিমোট ডায়াগনোসিস, সেকেন্ড ওপিনিয়ন সিস্টেম এবং যৌথ সার্জারি প্রশিক্ষণ মডেল চালু করতে চাই। তুরস্কের বিশ্বস্বীকৃত ‘জিরো ইনফেকশন সার্জিক্যাল মডেল’ বাংলাদেশে প্রয়োগ করা হবে।”

বাংলাদেশে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় বিদেশনির্ভরতা কমবে, চিকিৎসকরা প্রশিক্ষিত হবেন এবং দেশের স্বাস্থ্যখাতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।