ঢাকা , সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
৬৬৬ কোটি টাকার করের রায় স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণের ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ নিয়ে সন্ধ্যা লাইভে আসছেন আসিফ মাহমুদ সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না সরকার: আইনমন্ত্রী মাগুরায় সাকিবের বাড়িতে শুরু হয়েছে সংস্কার কাজ হাসিনা অসুস্থতার কারণে তাকে সংবাদ সম্মেলন দেখা যায় না: আসিফ নজরুল পশ্চিমবঙ্গে ২৫২ টি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ ডাকসুর সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি সরাতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে ছাত্রদল আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আ.লীগ ব্যবসায়ী ও এমপিদের প্রটেকশন দিয়েছে: রাশেদ খাঁন এআই না জানলে মুসলিমরা পিছিয়ে পড়বে: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি: স্পিকার

চুল কাটতে বের হয়ে অপরাধ চক্রের হাত রায়হান, ৭ মাস পর ফিরল এক পা ও কিডনি হারিয়ে

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১১:৩১:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে

এবার মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ রায়হান। সেদিনের সেই চঞ্চল শিশুটি দীর্ঘ সাত মাস পর যখন ঘরে ফিরল, তখন তার ডান পাটি নেই। পেটের ডান পাশে পিঠে রয়ে গেছে তাজা অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ দাগ। ঢাকার একটি ভয়ংকর অপরাধ চক্রের হাত থেকে কোনোমতে পঙ্গু অবস্থায় ফিরে আসা এই শিশুর শরীরে এখন শুধুই নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন। চক্রটি শিশুটিকে পঙ্গু বানিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার পাশাপাশি তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গও কেটে বিক্রি করে দিয়েছে বলে সন্দেহ করছে পরিবার।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার অটো রিকশাচালক নাজিম উদ্দীনের ছেলে রায়হান। গত সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঐতিহ্যবাহী চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে চিনে ফেলেন। পরে খবর পেয়ে বাবা দ্রুত ছুটে এসে ছেলেকে উদ্ধার করেন। ঘটনার বিবরণ দিয়ে শিশু রায়হান বলে, ‘আমি চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে কক্সবাজার চলে যাই। সেখানে কিছু ছেলের সঙ্গে পরিচয় হলে তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে যাই। সেখান থেকে কিছু লোক আমাকে চারপাশে বাগান আর মাঝখানে একটা ঘর, এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে আমার মতো আরও অনেক ছেলেমেয়ে ছিল।

রায়হান বলে, ‘একদিন রাতে সেখানে ঘুমিয়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার একটা পা নেই। কারণ জানতে চাইলে তারা বলে, আমি নাকি ট্রেনে অ্যাক্সিডেন্ট করেছি। প্রতিদিন আমাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করাত এবং ভিক্ষার টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখত। আমাদের সঙ্গে দুই জন পুরুষ ও সালমা নামের এক মহিলা ছিল। সেখানে অনেকেরই হাতপা কাটা ছিল। একপর্যায়ে তারা আমাকে বাসে তুলে দিলে আমি চুনতি মাহফিলে চলে আসি।রায়হানের পিতা সিএনজিচালক নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘রায়হান হেফজখানায় পড়ত, একটু দুষ্টামি করত বলে পানের ক্ষেতে কাজে নিয়ে যেতাম। ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটতে পাঠালে সে কক্সবাজার চলে যায় এবং পরে কমলাপুরে নিয়ে গিয়ে তার এক পা কেটে ভিক্ষায় নামানো হয়। মাহফিলে এক লোক তাকে দেখে খবর দিলে, সেখানে গিয়ে ছেলেকে দেখে দুজনে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলি। তবে অভাবের কারণে নিখোঁজ হওয়ার পর জিডি করতে পারিনি।

সন্তানের এই করুণ দশা নিয়ে লোহাগাড়া থানায় গেলে আইনি সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি ১০০ টাকা দিয়ে ছেলেকে চুল কাটতে পাঠিয়েছিলাম। ওর বরাতে যা জানলাম, ও যখন ফিরে আসে তখনই থানায় অভিযোগ করতে গেলে তারা কোনো অভিযোগ নেয়নি। উল্টো বলে, ঘটনাটি কমলাপুরের, সেখানের সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করতে হবে। আমি গরিব মানুষ, দিনে এনে দিনে খাই; ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করার সেই সামর্থ্য তো আমার নেই।

সীরাত মাহফিলে রায়হানকে প্রথম দেখতে পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী বলেন, ‘রাত ১২টার পর সীরাত মাহফিলের ভিড়ের মধ্যে এক পায়ে ভর দিয়ে একটি ছোট ছেলেকে ভিক্ষা করতে দেখি। মুখটা চেনা চেনা লাগায় কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করতেই সে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমি নাজিম মিয়ার ছেলে রায়হান।আমরা সবাই চমকে উঠি! সাত মাস আগে নিখোঁজ হওয়া সুস্থসবল রায়হানের এই পঙ্গু অবস্থা দেখে মাহফিলের মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, ‘সে একজন সাধারণ অটো রিকশাচালক, অত্যন্ত নিরপরাধ পরিবার। তার ১২ বছরের শিশুসন্তানের সঙ্গে যে বর্বরতা করা হয়েছে, তা মানুষের কল্পনার বাইরে। এটি শুধু অপরাধ নয়, চরম মানবতাবিরোধী কাজ। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

থানায় আইনি সহায়তা না দেওয়ার বিষয়ে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, শিশুটি ৭ মাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেও তার পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ কিংবা জিডি করেনি। পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, ‘তার পরিবার জানিয়েছে সে নাকি কক্সবাজারে ১ মাস ছিল, এরপর সেখান থেকে কমলাপুর নেওয়া হয়েছিল। তাই আমরা তাদেরকে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছি।এদিকে, রায়হান নিখোঁজ থাকার সময়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ওই ভিডিওতে রায়হানকে বলতে দেখা যায়, জায়গা সংক্রান্ত মামলায় তার বাবা কারাগারে এবং সৎমা মারধর করায় সে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় চলে এসেছে। তবে স্বজনেরা বলছেন, ভয়ে বা কারও শেখানো কথায় শিশুটি ভিডিওতে এমন মন্তব্য করে থাকতে পারে।

মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘বাংলাদেশে গত ৭ মাসে প্রায় ১৪ হাজার শিশু এভাবে নিখোঁজ হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, একটা চক্র তাদেরকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কর্তন করার পর কাজে লাগাচ্ছে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। প্রশাসন এ বিষয়ে গুরুত্ব না দিলে যেকোনো সময় যেকোনো কারও বাচ্চা এভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারাতে পারে অথবা খুন হতে পারে।পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিএইচআএফ জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১৫,৭১৭ শিশুর নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩,৬৭৯ শিশু উদ্ধার হলেও ২,০৩৮ শিশু এখনও নিখোঁজ রয়েছে, যাদের সিংহভাগের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। বিএইচআএফএর চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান জানান, নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষা চক্রের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। মুন এলার্টের মতো জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা দেশব্যাপী কার্যকর করা এবং নিখোঁজ শিশুদের জন্য সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা রাষ্ট্রের জরুরি দায়িত্ব।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

৬৬৬ কোটি টাকার করের রায় স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণের

চুল কাটতে বের হয়ে অপরাধ চক্রের হাত রায়হান, ৭ মাস পর ফিরল এক পা ও কিডনি হারিয়ে

আপডেট সময় ১১:৩১:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এবার মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ রায়হান। সেদিনের সেই চঞ্চল শিশুটি দীর্ঘ সাত মাস পর যখন ঘরে ফিরল, তখন তার ডান পাটি নেই। পেটের ডান পাশে পিঠে রয়ে গেছে তাজা অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ দাগ। ঢাকার একটি ভয়ংকর অপরাধ চক্রের হাত থেকে কোনোমতে পঙ্গু অবস্থায় ফিরে আসা এই শিশুর শরীরে এখন শুধুই নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন। চক্রটি শিশুটিকে পঙ্গু বানিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার পাশাপাশি তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গও কেটে বিক্রি করে দিয়েছে বলে সন্দেহ করছে পরিবার।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার অটো রিকশাচালক নাজিম উদ্দীনের ছেলে রায়হান। গত সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঐতিহ্যবাহী চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে চিনে ফেলেন। পরে খবর পেয়ে বাবা দ্রুত ছুটে এসে ছেলেকে উদ্ধার করেন। ঘটনার বিবরণ দিয়ে শিশু রায়হান বলে, ‘আমি চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে কক্সবাজার চলে যাই। সেখানে কিছু ছেলের সঙ্গে পরিচয় হলে তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে যাই। সেখান থেকে কিছু লোক আমাকে চারপাশে বাগান আর মাঝখানে একটা ঘর, এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে আমার মতো আরও অনেক ছেলেমেয়ে ছিল।

রায়হান বলে, ‘একদিন রাতে সেখানে ঘুমিয়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার একটা পা নেই। কারণ জানতে চাইলে তারা বলে, আমি নাকি ট্রেনে অ্যাক্সিডেন্ট করেছি। প্রতিদিন আমাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করাত এবং ভিক্ষার টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখত। আমাদের সঙ্গে দুই জন পুরুষ ও সালমা নামের এক মহিলা ছিল। সেখানে অনেকেরই হাতপা কাটা ছিল। একপর্যায়ে তারা আমাকে বাসে তুলে দিলে আমি চুনতি মাহফিলে চলে আসি।রায়হানের পিতা সিএনজিচালক নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘রায়হান হেফজখানায় পড়ত, একটু দুষ্টামি করত বলে পানের ক্ষেতে কাজে নিয়ে যেতাম। ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটতে পাঠালে সে কক্সবাজার চলে যায় এবং পরে কমলাপুরে নিয়ে গিয়ে তার এক পা কেটে ভিক্ষায় নামানো হয়। মাহফিলে এক লোক তাকে দেখে খবর দিলে, সেখানে গিয়ে ছেলেকে দেখে দুজনে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলি। তবে অভাবের কারণে নিখোঁজ হওয়ার পর জিডি করতে পারিনি।

সন্তানের এই করুণ দশা নিয়ে লোহাগাড়া থানায় গেলে আইনি সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি ১০০ টাকা দিয়ে ছেলেকে চুল কাটতে পাঠিয়েছিলাম। ওর বরাতে যা জানলাম, ও যখন ফিরে আসে তখনই থানায় অভিযোগ করতে গেলে তারা কোনো অভিযোগ নেয়নি। উল্টো বলে, ঘটনাটি কমলাপুরের, সেখানের সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করতে হবে। আমি গরিব মানুষ, দিনে এনে দিনে খাই; ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করার সেই সামর্থ্য তো আমার নেই।

সীরাত মাহফিলে রায়হানকে প্রথম দেখতে পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী বলেন, ‘রাত ১২টার পর সীরাত মাহফিলের ভিড়ের মধ্যে এক পায়ে ভর দিয়ে একটি ছোট ছেলেকে ভিক্ষা করতে দেখি। মুখটা চেনা চেনা লাগায় কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করতেই সে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমি নাজিম মিয়ার ছেলে রায়হান।আমরা সবাই চমকে উঠি! সাত মাস আগে নিখোঁজ হওয়া সুস্থসবল রায়হানের এই পঙ্গু অবস্থা দেখে মাহফিলের মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, ‘সে একজন সাধারণ অটো রিকশাচালক, অত্যন্ত নিরপরাধ পরিবার। তার ১২ বছরের শিশুসন্তানের সঙ্গে যে বর্বরতা করা হয়েছে, তা মানুষের কল্পনার বাইরে। এটি শুধু অপরাধ নয়, চরম মানবতাবিরোধী কাজ। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

থানায় আইনি সহায়তা না দেওয়ার বিষয়ে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, শিশুটি ৭ মাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেও তার পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ কিংবা জিডি করেনি। পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, ‘তার পরিবার জানিয়েছে সে নাকি কক্সবাজারে ১ মাস ছিল, এরপর সেখান থেকে কমলাপুর নেওয়া হয়েছিল। তাই আমরা তাদেরকে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছি।এদিকে, রায়হান নিখোঁজ থাকার সময়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ওই ভিডিওতে রায়হানকে বলতে দেখা যায়, জায়গা সংক্রান্ত মামলায় তার বাবা কারাগারে এবং সৎমা মারধর করায় সে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় চলে এসেছে। তবে স্বজনেরা বলছেন, ভয়ে বা কারও শেখানো কথায় শিশুটি ভিডিওতে এমন মন্তব্য করে থাকতে পারে।

মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘বাংলাদেশে গত ৭ মাসে প্রায় ১৪ হাজার শিশু এভাবে নিখোঁজ হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, একটা চক্র তাদেরকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কর্তন করার পর কাজে লাগাচ্ছে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। প্রশাসন এ বিষয়ে গুরুত্ব না দিলে যেকোনো সময় যেকোনো কারও বাচ্চা এভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারাতে পারে অথবা খুন হতে পারে।পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিএইচআএফ জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১৫,৭১৭ শিশুর নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩,৬৭৯ শিশু উদ্ধার হলেও ২,০৩৮ শিশু এখনও নিখোঁজ রয়েছে, যাদের সিংহভাগের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। বিএইচআএফএর চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান জানান, নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষা চক্রের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। মুন এলার্টের মতো জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা দেশব্যাপী কার্যকর করা এবং নিখোঁজ শিশুদের জন্য সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা রাষ্ট্রের জরুরি দায়িত্ব।