শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের করুণ পতনের পরও দলের নীতি-নির্ধারকদের মাঝে কোনো আত্মসমালোচনা বা শিক্ষা গ্রহণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না—বরং নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক কার্যক্রমের মাঝেই তারা ফের দলকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুল নেতৃত্বের হটকারী সিদ্ধান্তে ঐতিহ্যবাহী এই দলটি আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে বলে মত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে টানা সাড়ে পনেরো বছরের ক্ষমতার পতন ঘটে আওয়ামী লীগের। জনরোষ থেকে বাঁচতে দলীয় সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদিন ভারতের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। তার পরিবার এবং বহু প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিও পরে পালিয়ে বিদেশে আশ্রয় নেন। এর আগে জুলাই আন্দোলনের দমন-পীড়নে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের দায়ে আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে চিহ্নিত হয়। ভুল রাজনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার ফলেই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
এরপর দেশজুড়ে গ্রেফতার ও আত্মগোপনে থাকা হাজারো কর্মী যখন চরম অনিশ্চয়তায়, তখন বিদেশে থাকা শীর্ষ নেতারা ভিডিও বার্তায় কর্মীদের সহিংসতায় উসকে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ১৩ নভেম্বরের ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ ঝটিকা মিছিলে নামতে দেখা যায়। এতে গ্রেফতার হচ্ছেন হাজারো নেতা-কর্মী।
বিশেষজ্ঞদের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা রাজনৈতিক অধিকার হলেও হুমকি-ধমকি ও সহিংস ভাষা ব্যবহার করে রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পথে এগোলে আওয়ামী লীগের ‘কামব্যাক’-এর সুযোগ নষ্ট হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা নেতৃত্বে থাকা限 পর্যন্ত দলটি ভুলের পথেই থাকবে। তিনি বলেন, চোরাগোপ্তা সন্ত্রাস করে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি করা গেলেও কোনো রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে পারে না। টিকে থাকতে হলে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে শুদ্ধি প্রক্রিয়া এবং দায়ীদের শাস্তি গ্রহণ করতে হবে।
দলীয় সূত্রের হতাশা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, পতনের দেড় বছর পরও কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বরং বিদেশে থাকা নেতাদের সহিংস কর্মসূচির কারণে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা আরও বিপদের মুখে পড়ছেন।
তাদের বক্তব্য—আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণই হওয়া উচিত দলের প্রধান লক্ষ্য; নির্বাচনের বাইরে থাকলে দল আরও বিলীন হয়ে যাবে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন মামলায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন—ফলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না।
শেখ হাসিনার বক্তব্যে বিপদে কর্মীরা
ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই শেখ হাসিনার বক্তব্য ও নির্দেশনা দলের মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি ও বিপদের কারণ হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। ‘পালটা আঘাত’, ‘যে যেখানে আছো সে-ই নেতা’, ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’—এসব বক্তব্যে উসকানি পেয়ে বহু কর্মী গ্রেফতার ও হামলার শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ১৩ নভেম্বরের লকডাউনকে ঘিরে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দলটির ওপর ‘অগ্নিসন্ত্রাস’ তকমা আরও জোরালো হয়েছে।
আরও বিপজ্জনক কর্মসূচি ঘোষণা
১৬–১৭ নভেম্বর ‘কমপ্লিট শাটডাউন’সহ টানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। বিদেশে থাকা নেতারা ভিডিও বার্তায় এসব কর্মসূচি সফল করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। আগামী সোমবার শেখ হাসিনার মামলার রায়কে কেন্দ্র করেও নতুন কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভারত থেকে দেওয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারগুলোও জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।
মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ ও বেদনা
দলের ত্যাগী ও প্রবীণ নেতারা মনে করছেন—সহিংসতা নয়, বরং ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে গণমানুষের রাজনীতিতে ফিরে আসাই দলকে বাঁচাতে পারে। উত্তরাঞ্চলের এক প্রবীণ নেতা বলেন, “সারাজীবন দলের জন্য ত্যাগ করেছি। এখন হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হচ্ছে—এটা মেনে নেওয়া কঠিন।”
তার মতে, এসব কর্মসূচি দলের সংকট আরও গভীর করবে, অথচ নেতৃত্ব এখনও তা বুঝতে চাইছে না।

ডেস্ক রিপোর্ট 



















