গাজায় যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবন ধসে ৮ শিশুসহ অন্তত ২১ জন নিহত
ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন বহন করা একটি ছয়তলা ভবন ধসে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আটটি শিশু রয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েক ডজন মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন বলে স্থানীয় উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভোরে গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় ভবনটি হঠাৎ ধসে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে জানান, এক বছরেরও বেশি সময় আগে ইসরাইলি হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর একদিকে বিপজ্জনকভাবে হেলে পড়েছিল। তবে আশ্রয়ের সংকটের কারণে বাস্তুচ্যুত কয়েকটি পরিবার সেখানে বসবাস করছিল।
ধসে পড়ার পর জীবিতদের উদ্ধারে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও মিসরের একটি দল স্থানীয় উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের অভাবে উদ্ধারকাজ ধীরগতিতে চলছে। প্রাথমিক পর্যায়ে হামাস-নিয়ন্ত্রিত সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালান।
গাজা সিটির সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক রায়েদ আল-দাহশান বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনো মানুষের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। ফলে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা এখনো রয়েছে।
তিনি বলেন, আশ্রয়ের সীমিত সুযোগের কারণে বাসিন্দারা ভবনটিতে উঠেছিলেন। তারা এটিকে নিরাপদ মনে করলেও একপর্যায়ে ভবনটি পুরোপুরি ধসে পড়ে এবং ঘুমন্ত মানুষের ওপর আছড়ে পড়ে। কাছেই তাঁবুতে থাকা উম্ম মোহাম্মদ বাকরুন জানান, ভবনটি ধসে পড়ার সময় তিনি ছেলের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তার ভাষায়, ঘটনাটি ভূমিকম্পের মতো মনে হয়েছিল। বিকট শব্দের পর চারপাশে পাথর পড়তে থাকে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই সর্বত্র মানুষের চিৎকার শোনা যায়।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মানসুর আবু মোহাম্মদ বলেন, ভবনটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ধসে পড়ে। তিনি জানান, প্রতিদিন ভবনটি থেকে একটি-দুটি করে পাথর খসে পড়ত। ভবনটি একদিকে হেলে পড়েছিল, কিন্তু সেখানে থাকা মানুষগুলোর অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, ভবনটির প্রায় ১০টি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারগুলো বসবাস করছিল। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) গাজা কার্যালয়ের প্রধান আলেসান্দ্রো ম্রাকিচ ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে ৭০ থেকে ১০০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
ম্রাকিচ আরও বলেন, গাজায় যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৪০০টি ভবন ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। শীতকাল সামনে থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। উদ্ধারকাজ চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিন তেল ও খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী রামিজ আলাকবারভ ভবন ধসের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে কাউকে জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে হওয়া উচিত নয়। তিনি গাজায় উদ্ধারকাজের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি এবং বাস্তুচ্যুতদের জন্য তাঁবু, ত্রিপলসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানান।
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ বলছে, সামরিক কাজে ব্যবহার করা হতে পারে এমন সরঞ্জাম ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে চলে যাওয়া ঠেকাতেই গাজায় কিছু সরঞ্জাম প্রবেশে বিধিনিষেধ রয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা ভূখণ্ডটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বর্তমানে তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন।
গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও গাজার মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলা ও অন্যান্য হামলায় হতাহত এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত রয়েছে।
গাজা যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার মধ্য দিয়ে। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয় বলে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এরপর থেকে গাজায় ৭৩ হাজার ৭৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে।
সূত্র: বিবিসি

ডেস্ক রিপোর্ট 


















