গত শুক্রবার, ডিসেম্বরের ১২ তারিখ—বিজয়নগর এলাকায় শরীফ ওসমান হাদির ওপর হত্যাচেষ্টার আগ পর্যন্ত, এই ঝাঁকড়া চুলের ক্যারিশমাটিক তরুণ বুদ্ধিজীবী ও জুলাই বিপ্লবের নেতাকে আমি খুব সামান্যই চিনতাম। শানিত কথার ঝলসানি লাগা তার অল্প কিছু আলাপ-সালাপ ছিল এমন, যা বুকের ভেতর বিদ্যুৎ চমকের মতো আঘাত করেছিল।
গত ছয় দিনে, যখনই সময় পেয়েছি, চেষ্টা করেছি এই উদিত তরুণ চিন্তক ও বিপ্লবীকে জানার—তার স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অনন্য সংগ্রামকে বোঝার, তার দুর্দান্ত ক্রিটিক্যাল রাজনৈতিক বিশ্লেষণের গভীরে ঢোকার। বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাওয়া অদম্য তরুণদের যে জীবনীশক্তিতে জুলাই বিপ্লব সম্ভব হয়েছে, শরীফ ওসমান হাদির মধ্যে তার এক অনবদ্য ঝলক দেখা যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনৈতিক তত্ত্বের যে অনুবাদ তিনি হাজির করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই অসামান্য।
হাদির রাজনৈতিক অবস্থানের কয়েকটি লক্ষণীয় দিক
- তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সচেতন দূরত্ব বজায় রেখেছেন।
- এনসিপির সমালোচনায় একবিন্দু ছাড় দেননি।
- ইউনূস সরকারের সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন।
- মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতো জুলাইয়ের চেতনাকেও ‘সোল এজেন্সি’ বানানোর অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ছিলেন।
- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে বিলাসিতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন।
- শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন ‘সুশীলদের মব’ হিসেবে—যেখান থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারব্যবস্থাকে পদ্ধতিগতভাবে কলুষিত করে বিচারকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে বলে তিনি যুক্তি হাজির করেন।
- সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদকে তিনি সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে সংগঠিত মোকাবিলার উদ্যোগ নেন।
নারী ও সংস্কৃতি বিষয়ে হাদির দৃষ্টিভঙ্গি
নারীদের গণপরিসরে অংশগ্রহণকে তিনি সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখেছেন। জুলাই-পরবর্তী নারীবিদ্বেষী আলাপে তাকে কখনো যুক্ত হতে দেখা যায়নি। বোরকা ও টি-শার্ট পরা মেয়েদের একসঙ্গে পথচলাকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। ‘জুলাইয়ের বোনেরা’ ছিলেন তার কাছে সংগ্রামের সহযোদ্ধা—কেবল আবেগের প্রতীক নয়।
ভারতীয় কলোনিয়াল আগ্রাসনের মোকাবিলায় স্বাধীনচেতা নাগরিক মানস গঠনের লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
রাজপথের দার্শনিক
অনর্গল বক্তা হাদি রাজনীতি বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বগুলো ভেঙে-চুরে সুশীল বয়ানের খোলস থেকে বের করে আমজনতার বোলচালে রাজপথে, মাঠে-ময়দানে নিয়ে এসেছিলেন।
ঢাকা–৮ আসনের তরুণ সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে তার উত্থান স্পষ্ট করে দেয়—নিরস্ত্র, হাস্যমুখের এই কবি ও বিপ্লবী বহু দেশবিরোধী ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপের জন্য ভয়ংকর হুমকিতে পরিণত হয়েছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী, একটি নামকরা মাদ্রাসার হাই অ্যাচিভিং ছাত্র—হাদির তুমুল জনপ্রিয়তা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত আলাপ, দুঃসাহসী বিশ্লেষণ আর সততা ও ইনসাফের সম্মিলন তাকে করে তুলেছিল এক অপ্রতিরোধ্য চরিত্র।
জুলাইয়ের রক্তাক্ত দিন ও হাদির বোনাস জীবন
চব্বিশের জুলাইয়ের শেষের ইন্টারনেট শাটডাউনের ভয়াল দিনগুলোতে রামপুরায় যে জনযুদ্ধ হয়েছিল, কারফিউ ভেঙে সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেওয়া ভাই ওসমানের বিবরণীতে দিনগুলো অমর হয়ে থাকবে।
হেলিকপ্টার বা উঁচু ভবনের ছাদ থেকে স্নাইপারের গুলিতে মাথার খুলি উড়ে যাওয়া তরতাজা তরুণ, বিনা উসকানিতে খুন হওয়া বেকারির শ্রমিক, ক্লাস নাইনের বাচ্চার লাশ—এইসব দেখে বেঁচে ফেরা হাদি তার ‘বোনাস জীবন’ ইনসাফ কায়েমের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।
সারাদিন রাজপথে লড়াই করে সারারাত ল্যান্ডলাইনে প্রবাসী ভাইদের দেশের খবর দিতেন। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ বাজি রেখে সংগ্রামে থেকেছেন। আবার ঘরে ফিরে ফ্লোরে বসে শাক-সবজি কেটে স্ত্রীকে সাহায্য করেছেন—পুরুষালি ইগোর তোয়াক্কা না করে। এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে বিরল।
ঝালকাঠি জেলার নলছিটি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা মুসলমান পরিবারে বেড়ে ওঠা—ভাইবোনের স্নেহে প্রতিপালিত—এই কনিষ্ঠ সন্তান এমন সব দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, যার সম্মিলন সত্যিই বিরল।
আগামীর বাংলাদেশের জন্য জুলাইয়ের গার্ডিয়ান এঞ্জেল, এক শক্তিশালী জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার পথে হাদির অমোঘ যাত্রা বহু পক্ষের বুকে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। তার মৃত্যুকে ঘিরে মিত্রদের মধ্য থেকেই যখন জুলাইয়ের সহযোদ্ধাদের ব্যাশ করে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা লোটার চেষ্টা চলছে, তখন সেই অপচেষ্টা রুখে দেওয়া জরুরি।
আজ ভাই হাদি তার শহীদি তামান্না পূর্ণ করেছেন। এই মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় অরাজকতা ও নাশকতার মাধ্যমে লাল জুলাইয়ের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নির্বাচন বানচালের চেষ্টার বিরুদ্ধে—জুলাইয়ের দুর্জয় ঐক্যের প্রকাশই হোক আমাদের শপথ।
লাল জুলাইয়ের র্যাপার, জুলাই বিপ্লবের কবিয়াল সংগ্রামী যোদ্ধা—শহীদ শরীফ ওসমান হাদি, লও সালাম।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























