‘আমি না থাকলে ইরানিরা ইসরায়েলকে ধ্বংস করে ফেলত। তখন আর কোনো ইসরায়েল থাকত না’ ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে ‘শক্তিশালী ইসরায়েল’-এর কৃত্রিম দাপটের মুখোশ খুলে গেল আরও একবার! অবৈধ ও কৃত্রিম রাষ্ট্র ইহুদিবাদী ইসরায়েল যে বিরতিহীন ও সর্বাত্মক মার্কিন সাহায্যের জোরেই টিকে আছে তা আবারও স্পষ্ট হল। এবার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন খোদ ইসরায়েলের প্রধান মদদদাতা মার্কিন সরকারের প্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও ট্রাম্প এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সমালোচনাকে এই দুই অপরাধী সরকারের মধ্যে একটি ‘সাজানো বিরোধ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, তবুও তাদের বক্তব্য অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু দুর্বলতা প্রকাশ করেছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইহুদিবাদী তথা জায়নবাদীরা আড়াল রাখার চেষ্টা করে এসেছে।
সম্প্রতি ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন যে ইসরায়েলের সামরিক শক্তির বড় অংশই এমন অস্ত্র ও গোলাবারুদের ওপর নির্ভরশীল, যার অর্থ ‘আমেরিকান করদাতাদের অর্থ’ থেকে আসে। অন্যদিকে ট্রাম্পও স্পষ্টভাবে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সহায়তা না থাকলে ‘ইসরায়েলের অস্তিত্বই থাকত না।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রায়ই নিজের বেফাঁস মন্তব্যের মাধ্যমে নানা গোপন বিষয় প্রকাশ করে ফেলেন, সম্প্রতি বলেছেন: “নেতানিয়াহু আমার সঙ্গে ভালোভাবে কাজ করেন, তবে তিনিই আপনাদের বলবেন যে প্রধান অস্ত্রগুলো আমাদের হাতে। পুরো চুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণে। বি–২ বোমারু বিমান এবং অন্যান্য সরঞ্জামও আমাদের।”
ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর পর ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ১২ দিনের যুদ্ধে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তেল আবিবকে সমর্থন দিয়েছিল, তবুও কয়েক দিনের মধ্যেই পরাজয়ের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যে যুদ্ধকে ইসরায়েল দাবি করেছিল যে তারা একাই লড়েছে। মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের আমলে ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেয়ার অঙ্গীকার করে। এছাড়া, ইসরায়েল যখনই কোনো যুদ্ধে জড়ায়, তখন ওয়াশিংটনের সহায়তার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আটকে পড়ার পরবর্তী দুই বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন (দুই হাজার ১৭০ কোটি) ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে ট্রাম্পের উল্লেখ করা বি–২ বোমারু বিমান, বাঙ্কার–ভেদকারী বোমা, গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রসহ ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কৌশলগত অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় সবই যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করে। স্থলবাহিনীর দুর্বলতার বিষয়টি বাদ দিলেও—যে বাহিনী হামাসের মতো তুলনামূলক ছোট একটি সংগঠনের বিরুদ্ধেও বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে—ইসরায়েলি সূত্রগুলোর মতে, মার্কিন সহায়তা ছাড়া ইসরায়েলি বিমান বাহিনী এক মাসও এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ চালিয়ে যেতে পারবে না।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ ১২ দিনের যুদ্ধের পর এক প্রতিবেদনে লিখেছিল, ‘দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী মার্কিন আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল, যা এই বাহিনীর অন্যতম বড় দুর্বলতা।’ ভ্যান্সের সমালোচনার আগে ট্রাম্পের মন্তব্য, ‘আমি না থাকলে ইসরায়েল থাকত না।’ —ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি অ্যাক্সিওস–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন, ‘আমি না থাকলে ইরানিরা ইসরায়েলকে ধ্বংস করে ফেলত। তখন আর কোনো ইসরায়েল থাকত না।’ এই বিরল স্বীকারোক্তি গত এক বছরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া এবং যুদ্ধের শেষ আঘাতটিও ইরানের পক্ষ থেকে আসা—এসবই দেখিয়েছে যে ইরানের মতো একটি শক্তির মুখোমুখি হয়ে ইসরায়েল কতটা দুর্বল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত আঞ্চলিক রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইসরায়েলকে সহায়তা করেছিল। তবুও ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে, হিব্রু ভাষার বিভিন্ন সূত্রের মতে, তা গাজায় দুই বছরের যুদ্ধের মোট ক্ষতির দ্বিগুণ। ইসরায়েলের যুক্তরাষ্ট্র–নির্ভরতা কতটা গভীর, তা নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও উপস্থাপক টাকার কার্লসন বলেছেন, ‘ইসরায়েল যেন আর লেবাননে হামলা না করে, তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো তাদের অস্ত্র সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া।’ এছাড়া মার্কিন উপস্থাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনা কাসপারিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের তেল আবিবস্থ রাষ্ট্রদূতের ‘ইসরায়েল না থাকলে আমেরিকাও থাকত না’— শীর্ষক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়—সামাজিক মাধ্যম এক্স–এ লিখেছেন, ‘আমার বাবা ইসরায়েলের চেয়েও বয়স্ক। সামরিক সহায়তা বন্ধ করুন, তারপর এর পতন দেখুন।’
উপসংহারে বলা যায় যে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য দখলদার ও অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েলের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ শক্তিশালী রাষ্ট্র’-এর ধারণাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
লেখক: আলীরেজা মোহাম্মাদি, বিশিষ্ট ইরানি গবেষক সূত্র: পার্সটুডে

ডেস্ক রিপোর্ট 






















