যুক্তরাজ্যের অধীনে থাকা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে আর্জেন্টিনা। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কুইর্নো দ্বীপটিতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা বন্ধের দাবি জানিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও চূড়ান্ত সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান জানান।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বুয়েনস আইরেসের সার্বভৌমত্বের দাবিকে সমর্থন করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেয়ার পর নতুন করে এই আহ্বান জানানো হলো। পাবলো কুইর্নো দাবি করেন, দ্বীপগুলোর ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌম অধিকার রয়েছে এবং দ্বীপটি ব্রিটেনের দখলে থাকার কারণে তাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন হচ্ছে।
জানা যায়, ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে সমর্থনের অভাবের কারণে যুক্তরাজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা প্রশ্ন পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে পেন্টাগন। এদিকে ফকল্যান্ড সরকারের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করা হয়েছে। তারা জানায়, ২০১৩ সালের গণভোটে দ্বীপের ৯৯.৮ শতাংশ মানুষ ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবেই থাকতে চেয়েছে।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের ব্রিটিশ প্রবীণ যোদ্ধারাও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন। তবে আর্জেন্টিনা ২০১৩ সালের গণভোটকে প্রত্যাখ্যান করে এটিকে প্রহসন বলে অভিহিত করেছে। দেশটির অভিযোগ, যুক্তরাজ্য কৃত্রিমভাবে জনসংখ্যা বসিয়েছে দ্বীপটিতে।
শনিবার আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কুইর্নো বলেন, ‘জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির ব্রিটিশ ব্যাখ্যা আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। জাতিসংঘ কখনই ফকল্যান্ডের বর্তমান বাসিন্দাদের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এই বাসিন্দারা একটি ভূখণ্ডগত বিরোধের পক্ষভুক্ত, তাই তাদেরই এই বিরোধের সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে দাঁড় করানো গ্রহণযোগ্য নয়।’
এ কারণে ২০১৩ সালের গণভোটকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আবারও দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করে কুইর্নো বলেন, ‘আমরা আশা করি, আলোচনার মাধ্যমে এই সার্বভৌমত্ব বিরোধের শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে এবং ব্রিটেনের এই বিশেষ ঔপনিবেশিক অবস্থার অবসান ঘটবে।’
অন্যদিকে ফকল্যান্ড সরকার জানিয়েছে, তারা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে। এ নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের মুখপাত্র বলেন, ‘দ্বীপগুলো যে ব্রিটিশ, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই এবং সরকার এটি রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সার্বভৌমত্ব যুক্তরাজ্যের এবং দ্বীপবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।’
আর্জেন্টিনা মাঝে মধ্যেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর নিজেদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। সম্প্রতি পেন্টাগনের ফাঁস হওয়া একটি ইমেইলে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ন্যাটোর সমর্থনের অভাব মোকাবিলায় সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলোর ঔপনিবেশিক অঞ্চল নিয়ে কূটনৈতিক সমর্থন পুনর্বিবেচনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া, শক্ত মিত্র দেশগুলোকে ন্যাটো থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেয়ার কথাও বিবেচনায় রয়েছে, যার মধ্যে স্পেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ওয়াশিংটন আর্জেন্টিনাকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সরবরাহ চুক্তি মেনে নিতে যুক্তরাজ্যকে বাধ্য করেছে বলেও জানা গেছে। যদিও যুক্তরাজ্যের এ বিষয়ে ভেটো দেয়ার সুযোগ ছিল না, তবুও তারা আপত্তি জানাতে পারত।
গত বছর ডেনমার্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান গ্রহণ করে আর্জেন্টিনা, যা পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে দেশটির জন্য বিরল সামরিক সহায়তার উদাহরণ। ফকল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাজ্য আর্জেন্টিনার কাছে কোনো অস্ত্র বা যন্ত্রাংশ রপ্তানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই গত বছর বলেছিলেন, ফকল্যান্ড (লাস মালভিনাস নামেও পরিচিত) পুনরুদ্ধারের দাবি ছেড়ে দেবেন না তিনি। লন্ডনের সাথে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার কথা বললেও, তিনি এই অঞ্চল পুনরুদ্ধারকে অপরিবর্তনীয় বলে বর্ণনা করেন। সম্প্রতি তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তার সরকার দ্বীপগুলোকে আর্জেন্টিনার হাতে ফিরিয়ে আনতে মানবিকভাবে যা সম্ভব সবই করছে।
উল্লেখ্য, ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষ থাকলেও পরে যুক্তরাজ্যকে সামরিক ঘাঁটি ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়। ব্রিটিশ কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক বলেন, ‘ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ, যা বহুদিন ধরেই প্রতিষ্ঠিত। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমাদের এই অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে রক্ষা করতে হবে।’

ডেস্ক রিপোর্ট 






















