মাসখানেক থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে একটি বা দুটি করে ইয়াবা সেবন করতেন সিদ্ধার্থ দাস। গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবেশী সীমান্তের বাড়িতে গিয়ে তিনটি ইয়াবা সেবন করেন তারা। তবে সীমান্ত এসব সেবন করতেন না। এরপর মধ্য রাতে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছে জাগলে শান্ত নামে এক মাদক কারবারিকে ফোন করে আরো কয়েকটি ইয়াবা কেনেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
পরে প্রতিবেশী দেবুদের তিনতলা বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে নির্মাণাধীন দোতলার ছাদ দিয়ে পাশের গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে যান তারা। দেবুর বাড়ি ঢোকার সময় গেটে কুকুর থাকায় দেওয়াল টপকে পার হন।
এরপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতে থাকেন। ইয়াবা সেবন করতে করতে তখন ভোরের আলো ফুটতে থাকে। ওই রাতে হত্যাকাণ্ডের আগে তারা আট পিস ইয়াবা সেবন করেন। এর আগে সিদ্ধার্থ দাস ওই ছাদে এক-দু’দিন ইয়াবা সেবন করলেও মুগ্ধ সেদিন প্রথম বারের মতো সেখানে যান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এভাবেই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন সিদ্ধার্থ দাস।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা বলেন, ওইসময় ছাদে ওঠেন গণপতি চক্রবর্তী। ছাদে দুজনকে দেখে রেগে যান গণপতি চক্রবর্তী। তখন মানসম্মানের ভয়ে গণপতি চক্রবর্তীর ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। এসময় গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তিও হয়। এরপর মরদেহ ছাদের এক কোণায় রেখে টিন দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। টিনের শব্দ পেয়ে বা যেকোনোভাবে ছাদে উঠে আসেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী।
এসময় মুগ্ধ সেই গামছা দিয়ে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলা পেঁচিয়ে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর গলা ও মুখ চেপে ধরেন। প্রীতিলতাকে মারার পর দুজনে মিলে পাশে থাকা রশি ও গামছা পেঁচিয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীকেও শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
পাশের ছাদ থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায় এজন্য সেখান থেকে মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছে এনে রেখে দেন তারা। এরপর নিচে নেমে আসলে ঘুম থেকে জেগে উঠে বিছানায় বসে থাকতে দেখেন আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে। তখন প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
বাড়িতে সিসি ক্যামেরা রয়েছে সন্দেহে নিচতলায় নেমে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন সিদ্ধার্থ। এসব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে দুজনে সেখানে গোসল করেন এবং সেখানে বসে আরো একটি ইয়াবা সেবন করেন। এছাড়া খেজুর ও শসাও খান।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা বলেন, ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তারা ডাকাতির ঘটনা সাজান তারা। ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করেন এবং ওই বাড়িতে থাকা কিছু স্বর্ণ এবং ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জুমার নামাজের সময় ছাদ দিয়ে আবারো বেরিয়ে যান দুজন। ১৫ হাজার টাকা নেন মুগ্ধ আর সেই স্বর্ণ সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে মাটিতে পুঁতে রাখেন সিদ্ধার্থ। যা পূর্ণিমা জানতেন না।
পেশায় স্বর্ণ কারিগর সিদ্ধার্থ দাস ওই বাসায় গহনা বের করে আগুন ধরিয়ে তা পরীক্ষাও করে দেখেন। আলামত হিসেবে খেজুরের বিচি, আগুনে পোড়ানো চুরি, ইয়াবা সেবনের উপকরণ জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
এ ঘটনায় রবিবার (২৩ আগস্ট) ভোরে দুজনকে আটক করে পুলিশ। পরে বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ওইদিন রাতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন দুই আসামি।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকালে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল। ঘটনার পর সে একটি ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসাও নেয়।
পরে একটু অদূরে মুগ্ধর বাড়িতে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায় মুগ্ধ। এসময় পুলিশ এক ঘন্টার বেশি সময় ধরে ধাওয়া করে তাকে তুতফার্ম এলাকা থেকে আটক করা হয়। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করেন।
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, এই আলোচিত ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে।
ঘটনার তদন্ত কোনো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী করছে না। তদন্ত করছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে দেরি হবে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে এলেই আমরা এ বিষয়ে চূড়ান্ত একটি রূপরেখা দাঁড় করাতে পারবো বলে আশা করছি।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















