নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা নদীতে অবৈধ পাথর উত্তোলনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজির কথিত নেটওয়ার্ক। নদীতে মেশিন নামানো থেকে শুরু করে নৌকা চালানো, পাথর পরিবহন ও প্রসেসিং—প্রতিটি ধাপেই নির্ধারিত ‘রেটচার্ট’ অনুযায়ী টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, শুধু মেশিন ও নৌকা থেকেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে। এর বাইরে টলি ও পাথর প্রসেসিং কেন্দ্র থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের তেলীরবাজার পয়েন্টে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই এলাকাতেই বর্তমানে শতাধিক ভারী শ্যালো মেশিন ও প্রায় আড়াই শ ইঞ্জিনচালিত নৌকা সক্রিয় রয়েছে। এসব যন্ত্র দিয়ে দিন-রাত তিস্তার তলদেশ থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কথিত ‘রেটচার্টে’ প্রতিটি মেশিন থেকে সপ্তাহে ৭ হাজার টাকা, প্রতিটি নৌকা থেকে সপ্তাহে ১ হাজার টাকা, প্রতি টলি বা ট্রিপে ১০০ টাকা এবং প্রতিটি পাথর প্রসেসিং কেন্দ্র থেকে মাসে ৫ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
শুধু শতাধিক মেশিন ও প্রায় আড়াই শ নৌকার ওপর উল্লিখিত সাপ্তাহিক রেট ধরলে সপ্তাহে প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আদায়ের হিসাব দাঁড়ায়। মেশিন ও নৌকার প্রকৃত সংখ্যা এবং চাঁদার পরিমাণ বেশি হলে এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘লাইন মেইনটেন্যান্স’ ও প্রশাসনিক সুবিধার নামে এসব অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ফলে নদীতে যত বেশি মেশিন ও নৌকা নামছে, কথিত চাঁদার পরিমাণও তত বাড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিস্তা নদীর তিস্তাবাজার, তেলীরবাজার, চরখড়িবাড়ী, বাইশপুকুর, ছাতুনামা, দোহলপাড়া, কালীগঞ্জ ও ভেন্ডাবাড়ীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে পাথর উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র এসব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
নদী থেকে উত্তোলিত পাথর ঘাটে প্রতি সিএফটি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে কেনা হলেও বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে তা ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ফলে পাথর উত্তোলন ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
চাঁদাবাজির অভিযোগের পাশাপাশি নদীর তলদেশে চলছে ভয়াবহ পাথর উত্তোলন। শুষ্ক মৌসুমে ‘বোমা মেশিন’ এবং বর্ষায় শ্যালো মেশিন ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা ব্যবহার করে নদীর তলদেশে গভীর খাদ তৈরি করা হচ্ছে। এতে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও নদীতীরের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, তেলীরবাজার এলাকার মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে মো. মানিক মিয়া (৪৫) ও মো. আমির আলীর ছেলে জিয়ারুল হকের (৩৫) প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পাথর বাণিজ্য ও পরিবহন রুট পরিচালিত হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে তদারকি ও সরবরাহের সঙ্গে আরও কয়েকজনের নাম স্থানীয়ভাবে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মানিক মিয়া ও জিয়ারুল হক। মানিক দাবি করেন, তিনি কেবল একটি নৌকার মালিক এবং জিয়ারুলের একটি চক্রের সঙ্গে আংশিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। জিয়ারুল হক নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে মানিককেই মূল হোতা হিসেবে দাবি করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তলদেশ থেকে এভাবে পাথর তুলে নেওয়ার কারণে তিস্তার ডান তীরে ভাঙন তীব্র হচ্ছে। ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি তিস্তা সেচ প্রকল্পের বাঁধ ও তীরবর্তী জনপদও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়ছে।
নীলফামারী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ্-আল-মামুন বলেন, ইঞ্জিনচালিত কোনো যন্ত্র দিয়ে পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। নদী ও পরিবেশ রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, নদী থেকে এভাবে অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন বাঁধ ও নদীর স্থায়িত্বের জন্য চূড়ান্ত হুমকি। তিস্তার ডান তীরে ইতোমধ্যে তীব্র ভাঙনে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। তবে নদীতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি অবগত নন জানিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসনের ওপর ছেড়ে দেন।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, অবৈধ পাথর উত্তোলন রুখতে শিগগিরই বিজিবির সহায়তায় যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। বড় পরিসরে অভিযান চালিয়ে সরঞ্জাম জব্দসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার বলেন, “ইতোপূর্বেও আমরা সেখানে ৬৫ জনের একটি টিম পাঠিয়ে অভিযান চালিয়ে উদ্ধারকৃত মেশিনগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু অসাধু চোরের দল আবারও সুযোগ বুঝে নদীতে নেমেছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই টাস্কফোর্স গঠন করে তিস্তাকে রক্ষায় সর্বাত্মক অ্যাকশনে যাওয়া হচ্ছে।”

ডেস্ক রিপোর্ট 


















