দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক ও অন্যান্য অংশীজনদের বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বৈঠক থেকে সংকটের পুরোপুরি সমাধান না হলেও পরিস্থিতির ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি সম্ভব।
ব্যবসায়ী মহল প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সংকট মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রত্যাশা করছে। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সরকারের বসা জরুরি।
সংকট মোকাবিলায় অংশীজনদের পক্ষ থেকে কয়েকটি সুপারিশও এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সরকারি স্থাপনায় রুফটপ সোলার স্থাপন এবং আপাতত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানো।
বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাতের দাবি, বর্তমানে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে। অথচ এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব।
তার মতে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। এতে গ্যাসের একটি অংশ শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস—দুই সংকটেই কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।
ডেভিড হাসনাত বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী নেতা ও স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি ছোট পরিসরের বৈঠক হলে সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা সম্ভব। তার দাবি, এতে পরিস্থিতির ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি হতে পারে।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারাও দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা করছেন। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সংকট কত দিনে এবং কীভাবে কাটবে—এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী শিল্পকারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি পরিকল্পনা সাজাতে চান ব্যবসায়ীরা।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও সংকট মোকাবিলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পাশাপাশি কিছু গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ গ্যাস শিল্প খাতে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো গেলে সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকেও সংকট মোকাবিলায় তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, ভোলার গ্যাস দ্রুত কাজে লাগানো এবং দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন স্থাপনায় রুফটপ সোলার স্থাপনের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, শুধু দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নিলে চলবে না; তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—তিন ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, নতুন এলএনজি টার্মিনাল বা অতিরিক্ত গ্যাস আমদানির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। বরং অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, দ্রুত উত্তোলনযোগ্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং ভোলার গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। আর এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, বিশেষজ্ঞ ও বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি আলোচনা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















