রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। কোথাও আধ ঘণ্টা, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে।
রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম নারাইছড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ি পথ বেয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটতে হয় সেখানে পৌঁছাতে। উঁচু-নিচু পথ হওয়ায় কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। প্রায় পাঁচশ মানুষের বসবাস এই গ্রামে। তাদের পানির প্রধান উৎস একটি পাহাড়ি ছড়া। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে সেটিও শুকিয়ে গেলে দেখা দেয় চরম দুর্ভোগ।
গ্রামবাসীরা জানান, পানির চাহিদা মেটাতে ছড়ার বুকে গর্ত খুঁড়ে বাঁশের বেড়া দিয়ে মাটি আটকিয়ে অস্থায়ী কুয়া তৈরি করতে হয়। সেই কুয়ার জমা পানিই তখন একমাত্র ভরসা। কোথাও কোথাও সেটিও শুকিয়ে যায়। বছরের প্রায় ছয় মাস সুপেয় পানির জন্য সংগ্রাম করতে হয় তাদের।
নারাইছড়ি গ্রামের বাসিন্দা মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, শীতের পর থেকেই পানির কষ্ট শুরু হয়। পাশের ঝিরিতে অন্য সময় পানি পাওয়া গেলেও গরমে সেটাও শুকিয়ে যায়। তখন ঘণ্টাখানেক পাহাড়ি পথ হেঁটে অন্য গ্রাম থেকে পানি আনতে হয়। অনেক সময় প্রতিদিন গোসলও করা যায় না।
একই চিত্র জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির অনেক প্রত্যন্ত এলাকাতেও। পাহাড়ের ওপর বসতি হওয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপনও সম্ভব হয় না অধিকাংশ স্থানে। ফলে ঝিরি, ছড়া ও ঝর্নার পানির ওপরই নির্ভর করতে হয় স্থানীয়দের।
বাঘাইছড়ির কচুছড়ি গ্রামের বাসিন্দা রাহুল চাকমা বলেন, শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে কুয়ার পানি পাওয়া যায়। কিন্তু বর্ষায় সেই পানি ঘোলা হয়ে যায়। বিশুদ্ধ পানির জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দরকার।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত নভেম্বরের পর থেকে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি পাহাড়ি এলাকায়। ফলে পানির উৎসগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে কাপ্তাই হ্রদ থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। কেউ কেউ সেই পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করলেও হ্রদের পানির স্তর কমে যাওয়ায় সেখানেও সংকট বাড়ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রাঙামাটি জেলায় প্রায় ৫৮ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির আওতায় এসেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বছরের অর্ধেক সময় বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ পানিসংকটে ভোগেন।
রাঙামাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে ৫৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। বাকি এলাকাগুলোতেও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার বলেন, ঝর্নাভিত্তিক গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম, সোলার পাম্প এবং গ্রামীণ পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পানি সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বনায়ন ও ছড়াগুলো সংরক্ষণেও জোর দেয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখনো রাঙামাটির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানির সরবরাহের বাইরে রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের আশা, দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















