ঢাকা , রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাউন্সিলর হওয়ার ইচ্ছাই কাল হয়ে দাঁড়ায় জুলাইয়ে ভূমিকা রাখা ‘কাইল্যা’ পলাশের

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৯:২৮:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

 

রাজধানীর রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকার তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। গুলির আঘাতে তার মাথার ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তিনি বেঁচে থাকলেও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে আশাবাদী নন চিকিৎসকরা। তার জীবনে এমন পরিণতি নেমে আসার পেছনে তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই দায়ী করছেন এলাকাবাসী।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারামুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে এনসিপিতে যোগ দিয়ে রাজনীতি করার পরিকল্পনা করেছিলেন পলাশ। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কমিশনার প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছিলেন।

 

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পলাশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি কারাগারে থাকলেও রামপুরা ও হাতিরঝিল এলাকায় বিভিন্ন মিছিলসহ আন্দোলনে তার জনবল ও আর্থিক সহায়তা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

 

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় কারাগারে থেকে কীভাবে আন্দোলনে অংশ নেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির ওই কর্মকর্তা জানান, পলাশ দীর্ঘদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। এ সময় বিএনপি, জামায়াত ও শিবিরের একাধিক নেতাকর্মী সেখানে কারাবন্দি ছিলেন। আন্দোলনের আগে শিবিরের দুই কর্মীর সঙ্গে পলাশের আলোচনা হয়। সরকারের পতন হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে তাকে রেহাই দেওয়ার মৌখিক আশ্বাসের বিনিময়ে তিনি আন্দোলনে সব ধরনের সহযোগিতা করেন। এমনকি রামপুরা থানায় হামলা ও বিটিভিতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় তার লোকজনের সম্পৃক্ততা সে সময় পাওয়া যায় বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

 

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রামপুরা ও হাতিরঝিল থানা এলাকায় পলাশের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। গত মাসের ৭ তারিখ কারামুক্ত হয়ে তিনি কয়েক দিন আত্মগোপনে থাকার পর বাসায় ফিরে যান। চলতি মাসের শুরুতে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বাসায় ফুল নিয়ে যান পলাশ। এ সময় তিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার ইচ্ছার কথা জানান। বিএনপি নেতার পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে কারাগারে থাকাকালে পরিচিত শিবিরের ওই দুই নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা তাকে এনসিপিতে যোগ দিয়ে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করার পরামর্শ দেন এবং এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

 

স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কমিশনার নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পলাশ তার দৈনন্দিন চলাফেরায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে শুরু করেন। আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতেন। এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হন। তবে রাতের আঁধারে মাদকের ব্যবসা, ডিস লাইনের আয়-ব্যয় এবং বিভিন্ন গ্রুপের চাঁদা আদায়ের হিসাব-নিকাশ করতেন। এসব কার্যক্রম নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি স্থানীয় ইয়াবা ব্যবসায়ী, ফুটপাতের দোকানদার ও নবনির্মিত ভবন থেকে চাঁদা আদায়কারীদের তার বাসায় ডাকেন। তবে তার এই ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি। এ ঘটনায় শক্তিশালী দুটি গ্রুপের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পলাশের এমন আচরণ, এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং কমিশনার হওয়ার ইচ্ছাকে ভালোভাবে নেননি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। তার ছত্রচ্ছায়ায় থাকা স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে পলাশের সরাসরি বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই গুলির ঘটনার পেছনে এসব বিষয়ই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে এলাকাবাসী।

 

এদিকে ঢামেক হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন পলাশ। ২৪ ঘণ্টা পার হলেও তার অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। গুলির ঘটনায় ঘটনায় পলাশের স্ত্রী মাহমুদা বাদী হয়ে হাতিরঝিল থানায় হত্যা-চেষ্টার অভিযোগ দায়ের করেছেন।

 

মামলা সম্পর্কে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, তার স্ত্রী মাহমুদা একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই অভিযোগে কাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। এটি একটি গুলির ঘটনা। তদন্তের স্বার্থে কিছু তথ্য গোপন রাখতে হচ্ছে, যাতে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

 

পলাশকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা, মাদক ব্যবসা এবং আধিপত্য বিস্তারের বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, তদন্তের অংশ হিসেবে এলাকায় তিনি কী করতেন, কারা জড়িত থাকতে পারে এবং কী কী বিষয় এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে, সবকিছু মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত এ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

কাউন্সিলর হওয়ার ইচ্ছাই কাল হয়ে দাঁড়ায় জুলাইয়ে ভূমিকা রাখা ‘কাইল্যা’ পলাশের

আপডেট সময় ০৯:২৮:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

 

রাজধানীর রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকার তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। গুলির আঘাতে তার মাথার ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তিনি বেঁচে থাকলেও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে আশাবাদী নন চিকিৎসকরা। তার জীবনে এমন পরিণতি নেমে আসার পেছনে তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই দায়ী করছেন এলাকাবাসী।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারামুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে এনসিপিতে যোগ দিয়ে রাজনীতি করার পরিকল্পনা করেছিলেন পলাশ। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কমিশনার প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছিলেন।

 

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পলাশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি কারাগারে থাকলেও রামপুরা ও হাতিরঝিল এলাকায় বিভিন্ন মিছিলসহ আন্দোলনে তার জনবল ও আর্থিক সহায়তা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

 

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় কারাগারে থেকে কীভাবে আন্দোলনে অংশ নেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির ওই কর্মকর্তা জানান, পলাশ দীর্ঘদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। এ সময় বিএনপি, জামায়াত ও শিবিরের একাধিক নেতাকর্মী সেখানে কারাবন্দি ছিলেন। আন্দোলনের আগে শিবিরের দুই কর্মীর সঙ্গে পলাশের আলোচনা হয়। সরকারের পতন হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে তাকে রেহাই দেওয়ার মৌখিক আশ্বাসের বিনিময়ে তিনি আন্দোলনে সব ধরনের সহযোগিতা করেন। এমনকি রামপুরা থানায় হামলা ও বিটিভিতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় তার লোকজনের সম্পৃক্ততা সে সময় পাওয়া যায় বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

 

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রামপুরা ও হাতিরঝিল থানা এলাকায় পলাশের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। গত মাসের ৭ তারিখ কারামুক্ত হয়ে তিনি কয়েক দিন আত্মগোপনে থাকার পর বাসায় ফিরে যান। চলতি মাসের শুরুতে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বাসায় ফুল নিয়ে যান পলাশ। এ সময় তিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার ইচ্ছার কথা জানান। বিএনপি নেতার পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে কারাগারে থাকাকালে পরিচিত শিবিরের ওই দুই নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা তাকে এনসিপিতে যোগ দিয়ে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করার পরামর্শ দেন এবং এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

 

স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কমিশনার নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পলাশ তার দৈনন্দিন চলাফেরায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে শুরু করেন। আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতেন। এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হন। তবে রাতের আঁধারে মাদকের ব্যবসা, ডিস লাইনের আয়-ব্যয় এবং বিভিন্ন গ্রুপের চাঁদা আদায়ের হিসাব-নিকাশ করতেন। এসব কার্যক্রম নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি স্থানীয় ইয়াবা ব্যবসায়ী, ফুটপাতের দোকানদার ও নবনির্মিত ভবন থেকে চাঁদা আদায়কারীদের তার বাসায় ডাকেন। তবে তার এই ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি। এ ঘটনায় শক্তিশালী দুটি গ্রুপের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পলাশের এমন আচরণ, এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং কমিশনার হওয়ার ইচ্ছাকে ভালোভাবে নেননি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। তার ছত্রচ্ছায়ায় থাকা স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে পলাশের সরাসরি বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই গুলির ঘটনার পেছনে এসব বিষয়ই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে এলাকাবাসী।

 

এদিকে ঢামেক হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন পলাশ। ২৪ ঘণ্টা পার হলেও তার অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। গুলির ঘটনায় ঘটনায় পলাশের স্ত্রী মাহমুদা বাদী হয়ে হাতিরঝিল থানায় হত্যা-চেষ্টার অভিযোগ দায়ের করেছেন।

 

মামলা সম্পর্কে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, তার স্ত্রী মাহমুদা একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই অভিযোগে কাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। এটি একটি গুলির ঘটনা। তদন্তের স্বার্থে কিছু তথ্য গোপন রাখতে হচ্ছে, যাতে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

 

পলাশকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা, মাদক ব্যবসা এবং আধিপত্য বিস্তারের বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, তদন্তের অংশ হিসেবে এলাকায় তিনি কী করতেন, কারা জড়িত থাকতে পারে এবং কী কী বিষয় এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে, সবকিছু মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত এ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।