সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ও চলমান আইনি প্রক্রিয়াকে ঘিরে বাংলাদেশ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল দুবাই পৌঁছেছে। প্রাথমিক কার্যক্রম শেষ করে বেনজীর আহমেদকে দুবাই আল আওয়ার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুবাই ও বাংলাদেশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের জামিনের জন্য মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুবাই কোর্ট অব আপিলে তার আইনজীবী আবেদন দাখিল করেন। এ সময় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রতিনিধি দল একই আদালতে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আলাদা আরেকটি আবেদন করেন।
আবেদন যাচাই-বাছাই করে আদালত কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং দুবাইয়ের আইনানুগ বিষয় পর্যালোচনার জন্য আদালত সময় নিয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ১০-১৫ দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, ইন্টারপোলের দাখিল করা অভিযোগ এবং দুবাইয়ে অবস্থানের কারণসহ জামিনে মুক্তির জন্য সব ধরনের কাগজপত্র মঙ্গলবার দুবাইয়ের অফিসিয়াল সময়ের শুরুতেই পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে লিখিতভাবে জমা দেওয়া হয়।
আবেদন আদালত গ্রহণ করলেও জামিনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। চুড়ান্ত শুনানির জন্য দিন ধার্য করে জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে এর আগেই অর্থাৎ আগামী সাত দিনের মধ্যে তাকে জামিনে মুক্ত করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে বেনজীর আহমেদের আইনজীবী।
এদিকে বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ থেকে কমপক্ষে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে দুবাই পৌঁছেছে। এনসিবি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো) বা ইন্টারপোলের কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশ সদর দপ্তরের তিনজন এবং দেশের আলাদা দুটি গোয়েন্দা সংস্থার দুইজন সদস্য দুবাই গিয়ে মঙ্গলবার আদালতে বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পক্ষে বিভিন্ন অভিযোগ ও দুদকের মামলাসহ ইন্টারপোল নোটিশ-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। দুবাইয়ের আদালতের পাশাপাশি প্রতিনিধি দলটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে অংশ নিবে।
বেনজীর আহমেদের বাংলাদেশি আইনজীবীর কাছে দুবাইয়ের আইনজীবী ও বিচারকের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুবাইয়ের পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা অন্যান্য দেশের তুলনায় কঠোরভাবে পরিচালিত হয়। ফলে অনেক বিষয়ই গণমাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপির কাছে দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদের আগামী দিনগুলোতে কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার যেমন দুবাই থেকে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, একটি প্রতিনিধিদল দুবাই গেছেন, তেমনি তাকে জামিনে মুক্ত করার চেষ্টাও চলছে। তবে আগামী ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে দুবাই আদালত একটি সিদ্ধান্ত জানাবে।
দুবাই দূতাবাসে একসময় কর্মরত ছিলেন এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি দুবাইয়ের আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে প্রথমে দুবাই পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়। এরপর সাধারণত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাকে দুবাই পাবলিক প্রসিকিউশনে পাঠানো হয়। সেখানে প্রসিকিউশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের বৈধতা এবং অভিযোগকারী রাষ্ট্রের পাঠানো নথিপত্র যাচাই করে।
প্রাথমিক যাচাই শেষে মামলাটি পাঠানো হয় দুবাই কোর্ট অব আপিলে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২০০৬ সালের ৩৯ নম্বর ফেডারেল আইন (আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা আইন) অনুযায়ী, প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত মামলার প্রাথমিক শুনানির এখতিয়ার এই আদালতের। আপিল আদালতের রায়ে কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হলে তারা সর্বোচ্চ আদালত কোর্ট অব ক্যাসেশনে আপিল করার সুযোগ পায়।
জামিনের বিষয়ে তিনি বলেন, ইন্টারপোল-সংক্রান্ত প্রত্যর্পণ মামলায় সাধারণত অভিযুক্ত ব্যক্তির পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। পাশাপাশি দুবাইয়ে বসবাসরত কোনো নির্ভরযোগ্য বা প্রভাবশালী আমিরাতি নাগরিককে জামিনদার হিসেবে উপস্থাপন করতে হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থের বন্ড বা মুচলেকাও জমা দিতে হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে অভিযুক্ত পালিয়ে যাবেন না।
অন্যদিকে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকলে কোর্ট অব আপিল বা কোর্ট অব ক্যাসেশনের সংশ্লিষ্ট বিচারকের কাছে শুনানির দিন বা তার আগেই জামিনের আবেদন করা যায়।
আদালত যদি প্রত্যর্পণের পক্ষে মত দেন, তবুও অভিযুক্তকে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে হস্তান্তর করা হয় না। আদালতের রায়ের পরও প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিচার মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কার্যনির্বাহী কর্তৃপক্ষ। তাদের অনুমোদনের পরই প্রত্যর্পণ কার্যকর হয়।
দুবাইয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল যাওয়ার বিষয়ে আইজিপি, এআইজি মিডিয়াসহ এনসিবি শাখার কর্মকর্তাদের একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কাউকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডমিন) একেএম আওলাদ হোসেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বিষয়টি আমার জানা নেই।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















