সাপের কামড়ে মারা যাওয়া কলেজছাত্র শাহিন আকন্দের মৃত্যুর পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার বাবা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পুলাডারে তারা গাফিলতি করে মাইরা ফেলাইছে। আমি একজন দিনমজুর। সারা জীবন মজুরি করে যা কামাইছি, সব পুলার পিছনে ঢালছি। পুলাডা ভালো ছাত্র আছিল। তাই আমি কোনোদিন টেহার কথা চিন্তা করতাম না। এহন আমার পুলাডারে মাটির ঘরে রাইখা আইলাম।’
চিকিৎসায় অবহেলা ও সময়মতো অ্যান্টিভেনম না দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি এ ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাতে শেরপুর সদর উপজেলার হরিণধরা কান্দাপাড়া গ্রামে সাপের কামড়ে গুরুতর অসুস্থ হন শেরপুর সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শাহিন আকন্দ।
পরিবারের দাবি, সাপের কামড়ের প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে তাকে শেরপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে সেখানে চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
শাহিনের পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকদের শিফট পরিবর্তনের সময় চলছিল। জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের পরিবর্তে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরা তার রক্ত পরীক্ষা করান। এরপর তাকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয় এবং বলা হয়, ছয় ঘণ্টা বিশ্রাম নিলে তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। এ সময় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের।
শাহিনের জেঠাতো ভাই মো. সাব্বির আলী বলেন, ‘আমি পুরোটা সময় শাহিনের সঙ্গে ছিলাম। প্রথমে রক্ত জমাট বাঁধার পরীক্ষা করিয়ে তারা বলছিল, কিছু হয়নি। একটু সময় নিলে ঠিক হয়ে যাবে। রোগীর শরীরে কোনো বিষ নেই, বিষধর সাপও কামড়ায়নি। অথচ শাহিনের শরীর নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল। এরপরও তারা কোনো অ্যান্টিভেনম দেয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম নেই বলেও আমাদের জানানো হয়েছিল। প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট করার পর যখন শাহিনের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়, তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে পথেই তার মৃত্যু হয়। শুরুতেই চিকিৎসা দেওয়া হলে হয়তো তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো।’
শাহিনের বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তারা চিকিৎসা করতে পারবে না—এটা আমগরে আগেই কইতো। আমরা পুলাডারে মমিসিং (ময়মনসিংহ) নিয়ে যাইতাম। দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট কইরা শেষ সময়ে আইসা যখন কইলো, তখন আর হাতে সময় নাই। আমার কুলে ছটফটাইয়া পুলাডা মইরা গেল। আমি এই বিচার কার কাছে দিমু?’
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শেরপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইমরান বলেন, হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম রয়েছে। সাধারণত বিষক্রিয়া বেড়ে গেলে বা শ্বাসকষ্ট বাড়লে রোগীকে অন্যত্র রেফার করা হয়। শাহিনকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। হাসপাতালের রেজিস্টার খাতা দেখে বিষয়টি বলা যাবে।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। বিষয়টি জানার পরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। একই সঙ্গে শাহিনের বাবার সঙ্গে কথা বলে খোঁজখবর নিয়েছি। যেহেতু চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ এসেছে, তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

ডেস্ক রিপোর্ট 


















