ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মে কাজ করে নিজের সময় অনুযায়ী আয় করার আশায় অনেকেই রাইডার হিসেবে যুক্ত হন। কারও কাছে এটি বাড়তি আয়ের সুযোগ, কারও কাছে আবার পরিবারের খরচ চালানোর প্রধান মাধ্যম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাইডারদের অভিযোগ যেন বাড়ছেই। কম পারিশ্রমিক, কম অর্ডার, নানা ধরনের নিয়মকানুন, দেরি হলে জরিমানা, সামান্য সমস্যায় সাসপেনশন এবং প্রতিদিনের বাড়তি খরচ মিলিয়ে ফুডপান্ডায় রাইডার হিসেবে কাজ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যে কাজটি মূলত নিজের সময় অনুযায়ী স্বাধীনভাবে আয় করার সুযোগ হিসেবে শুরু করা হয়েছিল, সেটি কি ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে যেখানে রাইডারকে প্রতিটি বিষয়ে জবাবদিহি করতে হচ্ছে? আগে যেখানে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, এখন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা
রাইডারদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ পারিশ্রমিক নিয়ে। অনেকের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, আগে একই ধরনের ডেলিভারিতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যেত। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সেই পারিশ্রমিক কমে ৩০ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে নেমে এসেছে।
মিরপুর এলাকায় প্রায় এক বছর ধরে কাজ করা একজন রাইডারের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, আগে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা কাজ করেও মোটামুটি ভালো আয় করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন একই আয় করতে অনেক সময় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত রাস্তায় থাকতে হচ্ছে।
কল্যাণপুর থেকে মিরপুর ৬ এর মতো প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরত্বের একটি ডেলিভারির জন্য ৩২ টাকা পাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
একটি ডেলিভারিতে ৬ থেকে ৮ টাকা কমে যাওয়া হয়তো কাগজে খুব বড় সংখ্যা মনে নাও হতে পারে। কিন্তু দিনে ১৫টি অর্ডারে এই পার্থক্য দাঁড়ায় প্রায় ৯০ থেকে ১২০ টাকা। মাসে ২৬ দিন কাজ করলে পার্থক্য দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৩৪০ থেকে ৩ হাজার ১২০ টাকা।
এরপরও রাইডারকে বহন করতে হয় জ্বালানি, সাইকেল বা মোটরসাইকেলের মেইনটেন্যান্স, মোবাইল ডাটা, খাবার এবং রাস্তায় চলাচলের অন্যান্য খরচ।
অর্থাৎ অর্ডারপ্রতি পারিশ্রমিক কমার পাশাপাশি একজন রাইডারের বাস্তব খরচ কিন্তু কমছে না।
লেট ফি, জরিমানা আর নিয়মের বেড়াজাল শুধু পারিশ্রমিক কমে যাওয়াই নয়, রাইডারদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে নানা ধরনের নিয়ম ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
ডেলিভারিতে দেরি হলে লেট ফি, নির্দিষ্ট নিয়ম না মানলে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা, আর কোনো সমস্যা হলে পেনাল্টি বা সাসপেনশনের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করছেন অনেক রাইডার।
রাস্তায় কাজ করার বাস্তবতা কিন্তু সবসময় অ্যাপের হিসাব অনুযায়ী চলে না। যানজট, রাস্তার অবস্থা, বৃষ্টি, গাড়ির সমস্যা কিংবা রেস্টুরেন্টে অর্ডার প্রস্তুত হতে দেরি, এসব পরিস্থিতির অনেকটাই একজন রাইডারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
তারপরও কোনো কারণে ডেলিভারি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না হলে দায়ভার অনেক সময় রাইডারের ওপরই পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখানে প্রশ্ন হলো, রাস্তায় বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করা একজন রাইডারের জন্য নিয়ম থাকবে না, তা নয়। কিন্তু সেই নিয়ম প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি কতটা বিবেচনা করা হচ্ছে?
ফ্রিল্যান্সিং করতে এসে এত জবাবদিহি কেন? ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করার অন্যতম আকর্ষণ ছিল নিজের সময় অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ। অনেকেই নিয়মিত চাকরির পরিবর্তে এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন স্বাধীনভাবে কাজ করার আশায়।
কিন্তু রাইডারদের অভিযোগ, বাস্তবে কাজ করতে গিয়ে তাদের বিভিন্ন ধরনের নিয়ম, সময়সীমা এবং পারফরম্যান্সের চাপের মধ্যে থাকতে হয়। কখন অনলাইনে থাকতে হবে, কত দ্রুত অর্ডার সম্পন্ন করতে হবে, কীভাবে অর্ডার গ্রহণ করতে হবে, কখন সমস্যা জানাতে হবে, এসব বিষয়ে ক্রমাগত জবাবদিহির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এটি যদি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ হয়, তাহলে একজন রাইডারকে এত বেশি বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে কেন?
আর যদি এত নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণ থাকেই, তাহলে সেই অনুযায়ী ন্যায্য পারিশ্রমিক ও কাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে না কেন?
ব্যাগ আর গুডিজও নিজের টাকায়
আরেকটি বিষয়ও রাইডারদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাগ এবং বিভিন্ন গুডিজের জন্যও রাইডারদের নিজেদের টাকা খরচ করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি কাজ শুরু করতে এসে নিজের শ্রম দেওয়ার পাশাপাশি কাজের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের পেছনেও অর্থ ব্যয় করছেন।
তারপর ডেলিভারি পারিশ্রমিক যদি কমে যায়, অর্ডার কমে যায় এবং বিভিন্ন কারণে পেনাল্টি বা সাসপেনশনের ঝুঁকি থাকে, তাহলে একজন রাইডারের প্রকৃত আয় কতটা থাকে?
শুধু অর্ডারপ্রতি ৩০ বা ৩৫ টাকা দেখলে এই হিসাব বোঝা যাবে না। প্রকৃত হিসাব করতে হলে সরঞ্জামের খরচ, মেইনটেন্যান্স, জ্বালানি, মোবাইল খরচ, খাবার এবং কাজের সময় সবকিছু হিসাব করতে হবে।
গরিবের পেটে লাথি আর কতদিন?
রাইডাররা কোনো দয়া চান না। তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য চান।
একজন রাইডার রোদে, বৃষ্টিতে, যানজটের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় থাকেন। নিজের সাইকেল বা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। নিজের মোবাইল ডাটা খরচ করেন। নিজের ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে কাজ করেন। তারপরও একটি ডেলিভারি দেরি হলে পেনাল্টি, কোনো সমস্যা হলে সাসপেনশন এবং প্রতিটি বিষয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপরও যদি ডেলিভারিপ্রতি পারিশ্রমিক কমতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, রাইডারদের জন্য এই ব্যবস্থাটি আসলে কতটা টেকসই?
আজ যদি ৪০ থেকে ৫০ টাকার জায়গায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকা হয়, আগামী দিনে সেটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
আজ যদি একজন রাইডারকে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার পরিবর্তে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়, আগামী দিনে তাকে কত ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে হবে?
আর যদি এই পরিস্থিতি চলতেই থাকে, তাহলে ফুডপান্ডার ভবিষ্যৎ কি সত্যিই রাইডারদের সঙ্গে থাকবে?
নাকি একসময় রাইডাররা একে একে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যাবেন?
কারণ গরিবের পেটে লাথি মেরে কোনো ব্যবসা হয়তো কিছুদিন চলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিন টিকে থাকতে হলে সেই ব্যবসার সঙ্গে যারা প্রতিদিন রাস্তায় ঘাম ঝরাচ্ছেন, তাদেরও টিকে থাকার সুযোগ দিতে হয়।

ডেস্ক রিপোর্ট 



















