ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
অপরাধ চক্রের হাতে নয়, ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে পা কাটতে হয়েছে রায়হানের: এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট থেকে এক টাকাও না নেওয়ার দাবি মুসাদ্দিকের, ১২ মাসে প্রকাশ করেছেন ২৮টি বই সিগারেটের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি, ১০ শলাকার প্যাকেট সর্বোচ্চ ২১০ টাকা নির্ধারণ যৌথ সীমান্ত কমিশন চালু করল চীন-পাকিস্তান, ক্ষুব্ধ ভারত মানুষ যে ধরনের আইন চায়, সে ধরনের আইনই অনবে সরকার: আইনমন্ত্রী হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজে ইরানের হামলা, কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত ব্রিকসে যোগ দেওয়ার পর থেকে অসুস্থ চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের হামলায় ৪ আনসার আহত ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ায় এনসিপি নেত্রীকে পদ থেকে অব্যাহতি ইরানের সঙ্গে যু’দ্ধ শেষ পর্যায়ে: ট্রাম্প

২ যুগের মার্কিন যুদ্ধ: ৩ হাজার নিহতের বদলায় প্রাণ গেছে ৪৫ লাখ মানুষের

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:২১:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪১ বার পড়া হয়েছে

নাইনইলেভেনের এক মাসেরও কম সময় পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা চালায়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এই অভিযানকেসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা ওয়ার অন টেরোরহিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এরপর আফগানিস্তান, ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে একের পর এক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান চালানো হয়। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সেরকস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলোতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে আনুমানিক ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার সরাসরি এবং ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতায় পরোক্ষভাবে মারা গেছেন। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবরঅপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডমশুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবান ক্ষমতা হারালেও যুদ্ধ চলে প্রায় ২০ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের চার প্রেসিডেন্টের সময় ধরে চলা এই সংঘাত ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ। কস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হন। ক্ষুধা, রোগ ও চিকিৎসা না পাওয়া কারণে মারা যান আরও কয়েক লাখ। যুদ্ধের আগে আফগানিস্তানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার ছিল ৬২ শতাংশ। যুদ্ধের পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ শতাংশে। অবিস্ফোরিত অস্ত্র ও স্থলমাইন এখনও বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আফগানিস্তানে হামলা শুরুর দুই বছরেরও কম সময় পর ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ওমর বলেন, ‘আমাদের সেই বোমার শব্দগুলোর কথা মনে পড়ে, আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম।যুদ্ধ যখন বাগদাদে পৌঁছেছিল, তখন বিপদ সত্ত্বেও তার কয়েকজন বন্ধু পরিস্থিতি দেখতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ওমরের ভাষ্য, ‘আমি তাদের বলেছিলাম, তোমরা কেন যাচ্ছ? তারপর তারা গেল, আর ফিরে আসেনি। সেই কথা মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়।স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৪ সাল থেকে ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের হিসাবে, পাকিস্তানে ৪২৩টি মার্কিন হামলায় আনুমানিক ২ হাজার ৪৯৯ থেকে ৪ হাজার ১ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ৪২৪ থেকে ৯৬৬। ইয়েমেনেও অন্তত ১৮৬টি হামলা ও অভিযান চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ৮৫৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১৫৮ জন বেসামরিক। এছাড়া সোমালিয়ায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৯ থেকে ২৩টি হামলায় ১৮৮ থেকে ২৭৬ জন নিহত হয়েছেন।

২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে লিবিয়ায় বিক্ষোভ দমনের সময় বেসামরিক মানুষকে রক্ষার জন্য জাতিসংঘের অনুমোদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বিমান অভিযান চালায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, সাত মাসে লিবিয়ায় চালানো হয় প্রায় ৯ হাজার ৭০০টি হামলা। পরে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের হাতে গাদ্দাফি বন্দি ও নিহত হন। ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীনঅপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’-এ ব্যাপক বিমান ও স্থল অভিযান চালানো হয়। এতে কয়েক ব্যবহার করা হয়েছিল দশ হাজার বোমা। ২০১৮ সালের মধ্যে ধ্বংস ও প্রাণহানির মাত্রা ব্যাপক হয়ে ওঠে। কর্মকর্তারা ১ হাজার ৪১৭ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও সামরিক অভিযানে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণকারী লন্ডনভিত্তিক সংগঠন এয়ারওয়ার্সের হিসাবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৬০ হতে পারে।

কস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের হিসাবে, নাইনইলেভেনের পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের দেশেই বা বিদেশে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ। গত বছর ইরান ও পাকিস্তান প্রায় ২৯ লাখ আফগানকে সীমান্তের ওপারে ফেরত পাঠিয়েছে। ইরাকে ২০০৩ সালের আগ্রাসনের দুই দশক পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। ৪০ বছর বয়সী আফগান নারী আয়েশা জীবনের বড় একটি সময় আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে তার পরিবার প্রথম আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। ২০০০ সালে তারা ফিরে আসে। পরে ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর আবার দেশ ছাড়ে। ইরানে ১১ বছর থাকার পর তাকে ও তার সন্তানদের বহিষ্কার করে আফগানিস্তানে ফিরতে বাধ্য করা হয়। আয়েশা বলেন, ‘আমি বহুবার গিয়েছি এবং ফিরে এসেছি। সর্বশেষ আমরা সেখানে ১১ বছর ছিলাম। কিন্তু এরপর ইরানিরা আমাদের বের করে দেয় এবং আমার সন্তানদের স্কুল থেকেও বের করে দেয়।

আফগানিস্তানে ৮ লাখের বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করেছেন এসব যুদ্ধে। ২০২১ সালে সর্বশেষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজার আহত হন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মিত্র দেশগুলোর বাহিনী মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনা নিহত এবং ২৩ হাজার ৫০০এর বেশি আহত হয়েছেন দেশটিতে। ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, ইরাক যুদ্ধে ৩ হাজার ৪৮১ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩১ হাজারের বেশি আহত হন। যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি খরচও ছিল বিপুল।কস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে নাইনইলেভেন পরবর্তী যুদ্ধে অংশ নেয়া সাবেক সেনাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তার পেছনে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এর বড় অংশ এখনও পরিশোধ করা হয়নি। অনেক সাবেক সেনা এখনও মানসিক স্বাস্থ্যসংকটের মধ্যে রয়েছেন। কস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের পরিচালক স্টেফানি সাভেল আল জাজিরাকে বলেন, ‘নাইনইলেভেনের পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়ার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও সাবেক সেনাদের আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা চার গুণ বেশি। মানুষ বেশি হারে মানসিক সমস্যা ও আঘাত নিয়ে ফিরে আসছে এবং এরপরও তাদের অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ঘনঘন পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।

দুই দশকের যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর সঙ্গে আগামী কয়েক দশকে সাবেক সেনাদের চিকিৎসা ও সহায়তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে আরও ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে মোট খরচ অন্তত ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিচালনার পেছনে যত অর্থ ব্যয় করছে, ততটাই সুদ পরিশোধে ব্যয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই ঋণের বোঝা বহনের ভার পড়বে বর্তমানের ২৫ বছরের কম বয়সী প্রজন্মের ওপর। জরিপগুলোতে দেখা গেছে, বিদেশে আগ্রাসী যুদ্ধ চালানোর বিষয়ে মার্কিন জনগণের আগ্রহ কম। ইরানের বর্তমান যুদ্ধও দেশটির জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। সাভেল বলেন, ‘ট্রাম্পকে ভোট দেয়া কিছু মানুষ তাকে সমর্থন করেছিলেন কারণ তিনিঅন্তহীন যুদ্ধশেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং শান্তির কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছে। সোমালিয়া ও ইয়েমেনে বিমান হামলা বেড়েছে, সামরিক বাহিনীর নিয়ম শিথিল করা হয়েছে এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার ব্যবস্থাও কমানো হয়েছে। তার ওপর ইরানে এই যুদ্ধ শুরু করা হলো, ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌযানে হামলা হলোসব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, তিনি সর্বত্রই যুক্তরাষ্ট্রের সহিংস কর্মকাণ্ডের মাত্রা বাড়িয়েই চলেছেন।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

অপরাধ চক্রের হাতে নয়, ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে পা কাটতে হয়েছে রায়হানের: এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

২ যুগের মার্কিন যুদ্ধ: ৩ হাজার নিহতের বদলায় প্রাণ গেছে ৪৫ লাখ মানুষের

আপডেট সময় ১০:২১:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নাইনইলেভেনের এক মাসেরও কম সময় পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা চালায়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এই অভিযানকেসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা ওয়ার অন টেরোরহিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এরপর আফগানিস্তান, ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে একের পর এক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান চালানো হয়। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সেরকস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলোতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে আনুমানিক ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার সরাসরি এবং ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতায় পরোক্ষভাবে মারা গেছেন। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবরঅপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডমশুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবান ক্ষমতা হারালেও যুদ্ধ চলে প্রায় ২০ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের চার প্রেসিডেন্টের সময় ধরে চলা এই সংঘাত ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ। কস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হন। ক্ষুধা, রোগ ও চিকিৎসা না পাওয়া কারণে মারা যান আরও কয়েক লাখ। যুদ্ধের আগে আফগানিস্তানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার ছিল ৬২ শতাংশ। যুদ্ধের পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ শতাংশে। অবিস্ফোরিত অস্ত্র ও স্থলমাইন এখনও বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আফগানিস্তানে হামলা শুরুর দুই বছরেরও কম সময় পর ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ওমর বলেন, ‘আমাদের সেই বোমার শব্দগুলোর কথা মনে পড়ে, আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম।যুদ্ধ যখন বাগদাদে পৌঁছেছিল, তখন বিপদ সত্ত্বেও তার কয়েকজন বন্ধু পরিস্থিতি দেখতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ওমরের ভাষ্য, ‘আমি তাদের বলেছিলাম, তোমরা কেন যাচ্ছ? তারপর তারা গেল, আর ফিরে আসেনি। সেই কথা মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়।স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৪ সাল থেকে ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের হিসাবে, পাকিস্তানে ৪২৩টি মার্কিন হামলায় আনুমানিক ২ হাজার ৪৯৯ থেকে ৪ হাজার ১ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ৪২৪ থেকে ৯৬৬। ইয়েমেনেও অন্তত ১৮৬টি হামলা ও অভিযান চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ৮৫৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১৫৮ জন বেসামরিক। এছাড়া সোমালিয়ায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৯ থেকে ২৩টি হামলায় ১৮৮ থেকে ২৭৬ জন নিহত হয়েছেন।

২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে লিবিয়ায় বিক্ষোভ দমনের সময় বেসামরিক মানুষকে রক্ষার জন্য জাতিসংঘের অনুমোদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বিমান অভিযান চালায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, সাত মাসে লিবিয়ায় চালানো হয় প্রায় ৯ হাজার ৭০০টি হামলা। পরে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের হাতে গাদ্দাফি বন্দি ও নিহত হন। ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীনঅপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’-এ ব্যাপক বিমান ও স্থল অভিযান চালানো হয়। এতে কয়েক ব্যবহার করা হয়েছিল দশ হাজার বোমা। ২০১৮ সালের মধ্যে ধ্বংস ও প্রাণহানির মাত্রা ব্যাপক হয়ে ওঠে। কর্মকর্তারা ১ হাজার ৪১৭ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও সামরিক অভিযানে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণকারী লন্ডনভিত্তিক সংগঠন এয়ারওয়ার্সের হিসাবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৬০ হতে পারে।

কস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের হিসাবে, নাইনইলেভেনের পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের দেশেই বা বিদেশে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ। গত বছর ইরান ও পাকিস্তান প্রায় ২৯ লাখ আফগানকে সীমান্তের ওপারে ফেরত পাঠিয়েছে। ইরাকে ২০০৩ সালের আগ্রাসনের দুই দশক পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। ৪০ বছর বয়সী আফগান নারী আয়েশা জীবনের বড় একটি সময় আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে তার পরিবার প্রথম আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। ২০০০ সালে তারা ফিরে আসে। পরে ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর আবার দেশ ছাড়ে। ইরানে ১১ বছর থাকার পর তাকে ও তার সন্তানদের বহিষ্কার করে আফগানিস্তানে ফিরতে বাধ্য করা হয়। আয়েশা বলেন, ‘আমি বহুবার গিয়েছি এবং ফিরে এসেছি। সর্বশেষ আমরা সেখানে ১১ বছর ছিলাম। কিন্তু এরপর ইরানিরা আমাদের বের করে দেয় এবং আমার সন্তানদের স্কুল থেকেও বের করে দেয়।

আফগানিস্তানে ৮ লাখের বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করেছেন এসব যুদ্ধে। ২০২১ সালে সর্বশেষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজার আহত হন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মিত্র দেশগুলোর বাহিনী মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনা নিহত এবং ২৩ হাজার ৫০০এর বেশি আহত হয়েছেন দেশটিতে। ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, ইরাক যুদ্ধে ৩ হাজার ৪৮১ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩১ হাজারের বেশি আহত হন। যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি খরচও ছিল বিপুল।কস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে নাইনইলেভেন পরবর্তী যুদ্ধে অংশ নেয়া সাবেক সেনাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তার পেছনে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এর বড় অংশ এখনও পরিশোধ করা হয়নি। অনেক সাবেক সেনা এখনও মানসিক স্বাস্থ্যসংকটের মধ্যে রয়েছেন। কস্ট অব ওয়ারপ্রকল্পের পরিচালক স্টেফানি সাভেল আল জাজিরাকে বলেন, ‘নাইনইলেভেনের পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়ার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও সাবেক সেনাদের আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা চার গুণ বেশি। মানুষ বেশি হারে মানসিক সমস্যা ও আঘাত নিয়ে ফিরে আসছে এবং এরপরও তাদের অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ঘনঘন পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।

দুই দশকের যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর সঙ্গে আগামী কয়েক দশকে সাবেক সেনাদের চিকিৎসা ও সহায়তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে আরও ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে মোট খরচ অন্তত ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিচালনার পেছনে যত অর্থ ব্যয় করছে, ততটাই সুদ পরিশোধে ব্যয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই ঋণের বোঝা বহনের ভার পড়বে বর্তমানের ২৫ বছরের কম বয়সী প্রজন্মের ওপর। জরিপগুলোতে দেখা গেছে, বিদেশে আগ্রাসী যুদ্ধ চালানোর বিষয়ে মার্কিন জনগণের আগ্রহ কম। ইরানের বর্তমান যুদ্ধও দেশটির জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। সাভেল বলেন, ‘ট্রাম্পকে ভোট দেয়া কিছু মানুষ তাকে সমর্থন করেছিলেন কারণ তিনিঅন্তহীন যুদ্ধশেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং শান্তির কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছে। সোমালিয়া ও ইয়েমেনে বিমান হামলা বেড়েছে, সামরিক বাহিনীর নিয়ম শিথিল করা হয়েছে এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার ব্যবস্থাও কমানো হয়েছে। তার ওপর ইরানে এই যুদ্ধ শুরু করা হলো, ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌযানে হামলা হলোসব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, তিনি সর্বত্রই যুক্তরাষ্ট্রের সহিংস কর্মকাণ্ডের মাত্রা বাড়িয়েই চলেছেন।