ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা নেই বলে পেন্টাগনকে সতর্ক করেছেন মার্কিন ইউরোপিয়ান কমান্ডের (ইউকম) প্রধান জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেভিচ। তার মতে, দ্রুত অতিরিক্ত একটি নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন না করা হলে একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজস্ব বাহিনীর নিরাপত্তা নাকি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে হতে পারে।
শনিবার (১ আগস্ট) প্রকাশিত দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনকেভিচ বলেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
বর্তমানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পাঁচটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন রয়েছে, যা ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা করছে। বছরের শেষ দিকে আরও একটি ডেস্ট্রয়ার যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও টানা কয়েক মাসের অভিযানে বিদ্যমান যুদ্ধজাহাজগুলোর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাচ্ছে এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনও বাড়ছে।
গ্রিনকেভিচের এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক অভিযানের অন্যতম দায়িত্বশীল কমান্ডার। তার মূল্যায়ন পেন্টাগনের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা উদ্বেগেরই প্রতিফলন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব যুদ্ধজাহাজ দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে এসএম-৩ ও এসএম-৬ ধরনের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম।
তবে একই সঙ্গে এই ডেস্ট্রয়ারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনকে মোকাবিলায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল, ন্যাটো মিত্রদের সহায়তায় ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এগুলোর প্রয়োজন রয়েছে। ফলে ইসরায়েলের জন্য অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করলে অন্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
প্রতিবেদন বলছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই বিপুল পরিমাণ সামরিক সম্পদ ব্যবহার করেছে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাত চলাকালে ২০০টির বেশি থাড (THAAD) ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করা হয়েছে, যা দেশটির মোট মজুতের প্রায় অর্ধেক। পাশাপাশি ডেস্ট্রয়ার থেকে শতাধিক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রও ছোড়া হয়েছে।
ইসরায়েল নিজস্ব অ্যারো ও ডেভিডস স্লিং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করলেও সবচেয়ে তীব্র হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রভান্ডারের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলের প্রায় ৪৫ শতাংশ, থাড ইন্টারসেপ্টরের অন্তত অর্ধেক, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৫০ শতাংশ, টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং এসএম-৩ ও এসএম-৬ ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ২০ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উন্নত প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক অস্ত্রের ব্যবহার যত দ্রুত বাড়ছে, সেই হারে সেগুলোর উৎপাদন ও মজুত পুনর্গঠন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর অধিকারী যুক্তরাষ্ট্রকেও একাধিক সংকট একসঙ্গে মোকাবিলায় সীমিত সামরিক সম্পদের হিসাব কষে এগোতে হচ্ছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















