প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে এবং আলাদাভাবেও মোজতবা খামেনির অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তার বাবা নিহত হওয়ার পর থেকে তিনি আর জনসমক্ষে আসেননি। ওই হামলায় মোজতবাও আহত হন। গত ছয় মাসে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রকাশ হয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে, তিনি হালকা বা মাঝারি ধরনের আহত হয়েছেন এবং নেতৃত্ব দেয়ার মতো অবস্থায় আছেন। আবার কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন, এমনকি তার শরীরে বিকৃতি দেখা দিয়েছে। ফলে তেহরানের অন্য শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে তিনি কেবল নামমাত্র নেতা হয়ে আছেন।
দ্য টাইমস বলছে, মোজতবার নীরবতাই তাকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাধা। প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, ‘মোজতবা খামেনি গত ১৫০ দিনের বেশি সময় ধরে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেননি, এমনকি ল্যাপটপও খোলেননি। তিনি একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অবস্থান করছেন। হামলায় আহত হওয়ার কারণে তার মুখমণ্ডলেও বিকৃতি এসেছে। দিনের বেলায় তিনি বাঙ্কার থেকে বের হন না, কারণ মার্কিন গোয়েন্দা উপগ্রহে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মোজতবার বাবা নিহত হওয়ার আগে তাকে শনাক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্ভাব্য সব ধরনের সাইবার কৌশল ব্যবহার করেছিল। এর মধ্যে তেহরানের বিভিন্ন ট্রাফিক ক্যামেরা হ্যাক করে খামেনির দেহরক্ষী ও সহযোগীদের গাড়ি শনাক্ত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) এবং ইসরায়েলের ইউনিট ৮২০০ জানতে পেরেছিল, ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনি ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা কোথায় অবস্থান করছিলেন। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তাদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে মোজতবার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। আগের মতো কোনও প্রযুক্তিগত সূত্র কাজে লাগছে না। ফলে তাকে খুঁজে বের করতে এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় পুরোপুরি মানব গোয়েন্দা তথ্য (হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স বা হিউমিন্ট)—অর্থাৎ ইরানের ভেতরের গুপ্তচর ও তথ্যদাতাদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
দ্য টাইমসের দাবি, গোয়েন্দা মহলের একাংশের ধারণা, মোজতবা হয়তো ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাতেই নিহত হয়েছেন, অথবা পরে আঘাতের কারণে মারা গেছেন। কিন্তু রেভল্যুশনারি গার্ড তার বেঁচে থাকার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। এ কারণে মোসাদ ও সিআইএ এখন নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে—মোজতবা সত্যিই জীবিত কি না। যদি তিনি বেঁচে থাকেন, তাহলে তিনি তেহরানের ভূগর্ভস্থ কোনও সুড়ঙ্গে নাকি রাজধানী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের কোম শহরের কাছে একটি সামরিক বাঙ্কারে আছেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানে থাকা নিজেদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মোসাদ এখন মূলত মোজতবার জীবিত থাকা এবং তার অবস্থান শনাক্তের দিকেই নজর দিচ্ছে।
মোসাদের সাবেক বন্দি ও নিখোঁজবিষয়ক বিভাগের প্রধান রামি ইগ্রা দ্য টাইমসকে বলেন, ‘মোজতবা হয়তো ফোন ব্যবহার করছেন না। কিন্তু তিনি যদি জীবিত থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই অন্যভাবে যোগাযোগ করছেন। যেমন—কাগজে লেখা বার্তা, যা কয়েক ধাপের বার্তাবাহকের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া হয়। মোসাদ যদি তাকে খুঁজে পায়, তাহলে সেটি মানব গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমেই সম্ভব হবে। তবে তেহরানের সরকারও এ ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন।’ প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, আল–কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকেও একইভাবে খুঁজে বের করা হয়েছিল। তার কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়া এক বার্তাবাহককে অনুসরণ করেই সিআইএ তার অবস্থান শনাক্ত করেছিল।
রামি ইগ্রা বলেন, ‘মোজতবার কাছে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হলো, তার সঙ্গে যোগাযোগ আছে—এমন কাউকে গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ করা।’ দ্য টাইমস আরও জানিয়েছে, মোসাদের সাবেক আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আভনার আব্রাহাম দাবি করেছেন, মোজতবার অবস্থান গোপন রাখতে শুধু কঠোর নিরাপত্তাই নয়, তার মতো দেখতে একাধিক ব্যক্তিকেও ব্যবহার করছে ইরানের সরকার। হত্যার আশঙ্কা কিংবা গুরুতর আঘাত—যে কারণেই হোক, মোজতবা তার বাবার জানাজা ও দাফনের কোনও অনুষ্ঠানেই অংশ নেননি, যদিও সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। মাঝেমধ্যে তার নামে লিখিত বার্তা প্রকাশ করা হলেও, এখন পর্যন্ত তার কণ্ঠে কোনও অডিও বা ভিডিও বার্তা প্রকাশ হয়নি।
সাবেক এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তা দ্য টাইমসকে বলেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে মূল ভরসা মানব গোয়েন্দা তথ্যই। তবে এ কাজে সিআইএর সক্ষমতা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, ‘গত ৪০ বছর ধরে ইরান আমাদের জন্য কার্যত নিষিদ্ধ এলাকা। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মানব গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইসরায়েলের মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী এবং মোজতবাকে খুঁজে বের করার অভিযানে সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।’ এদিকে মোজতবা খামেনির অবস্থান জানা গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কী সিদ্ধান্ত নেবে—এ বিষয়ে সাবেক এক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা রসিকতা করে বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা অনেক ইরানি নেতাকে সরিয়েছি। তাই মোজতবার ক্ষেত্রেও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে তার জায়গায় এমন কেউ আসবেন কি না, যিনি ইরানের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতে বিশ্বাস করেন।’

ডেস্ক রিপোর্ট 




















