গত ৫ আগস্ট রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে মুনসুন কালচারাল অ্যালায়েন্স আয়োজিত ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ কনসার্টে গান গাচ্ছিলেন আর্ক ব্যান্ডের কিংবদন্তী শিল্পী হাসান। এ সময় দর্শকসারি থেকে তাকে লক্ষ্য করে পানির বোতল ছোড়া হয়। বোতলটি তার মাথায় লাগে। তবে পরিস্থিতি সামলে গান চালিয়ে যান এই গায়ক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- কে বা কারা মঞ্চে গাইতে থাকা আর্ক ব্যান্ডের হাসানকে লক্ষ করে বোতল ছুড়েছিল? এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র। ঘটনার একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সংগীতাঙ্গনের অনেকে বলছেন, ফুটেজ দেখে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কঠিন নয়। তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন শিল্পী ও দর্শকেরা।
এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিক ফ্যানস কমিউনিটি’। তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখা হয়েছে, বাংলাদেশের মঞ্চে দর্শকদের হাতে শিল্পীর অসম্মানিত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। আগেও বিভিন্ন কনসার্টে শিল্পীরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তবে প্রতিবারই কেন সম্মানিত শিল্পীদের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়, সেই প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি।
অনাকাঙ্ক্ষিত ওই ঘটনার পরও হাসান গান থামাননি। এটা নিয়ে ওই কমিউনিটির পোস্টে বলা হয়েছে- তিনি চাইলেই গান গাওয়া থামিয়ে দিতে পারতেন, মঞ্চে ক্ষোভ দেখিয়ে একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।
সংগঠনটির প্রশ্ন, ঘটনার পর আয়োজকেরা হাসানের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন কি না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন কি না।
এর আগে চট্টগ্রামের একটি কনসার্টে বে অব বেঙ্গল ব্যান্ডের পরিবেশনার সময় বখতিয়ার হোসেনের গায়ে পানি ছোড়ার ঘটনার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিক ফ্যানস কমিউনিটি। তাদের মতে, গানের মধ্যেই বখতিয়ার দর্শকদের পানি ছুড়তে নিষেধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
হাসানকে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের বড় একটি নাম উল্লেখ করে সংগঠনটি লিখেছে, ‘এই নামটির অবমাননা আমরা গ্রহণ করতে পারব না।’ আয়োজকদের অবস্থান পরিষ্কার করার পাশাপাশি দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে তারা।
একই সঙ্গে ফ্রি কনসার্ট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, বিনা মূল্যের কনসার্টে দর্শক নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ঘাটতি থেকে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাই প্রতীকী হলেও কনসার্টের প্রবেশমূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
ফ্রি কনসার্টের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সোলস ব্যান্ডের সদস্য মীর মাসুম লিখেছেন, যেদিন থেকে কনসার্ট ফ্রি হয়েছে, সেদিন থেকে অধঃপতন শুরু হয়েছে। ফ্রি কনসার্ট বন্ধ না হলে এ রকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
ঘটনার উদ্দেশ্য এবং কনসার্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গীতিকার ও সুরকার প্রিন্স মাহমুদ লিখেছেন, মঞ্চে শিল্পী হাসান যখন ব্যান্ড নিয়ে গান করছিলেন, তখন তাকে বোতল ছুড়ে মেরেছে কেউ কেউ। কেন? সামনের দিকে একটা দল “ভুয়া, ভুয়া” বলে চিৎকার করছিল। কারা? কী উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানে ছিল? ঘটনাস্থলে থাকা সিসিটিভি ও মুঠোফোনের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রিন্স মাহমুদ।
প্রিন্স মাহমুদের ফেসবুক পোস্টে চলচ্চিত্র অভিনয়শিল্পী মিশা সওদাগর লিখেছেন, ভাই, আমাদের সবার এক হওয়া উচিত। সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী ঘটনাটিকে খুবই দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। লুৎফর হাসান লিখেছেন, ‘এদের চিহ্নিত করা কঠিন না। শাস্তি হোক, দেখতে চাই।
গীতিকার ও সুরকার তানভীর তারেকও প্রশাসনের কাছে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, প্রিয় কণ্ঠশিল্পী হাসানকে অপমান করার চেষ্টা করেছে। কাল আরেকজনকে করবে। এদের প্রশ্রয় দিলেই এটা বাড়বে। তার মতে, প্রশাসনের পক্ষে ভিডিও দেখে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা কঠিন নয়।
হাসানকে দেশের অন্যতম সেরা রকস্টার উল্লেখ করে তানভীর তারেক আরও লিখেছেন, শিল্পীর অপমানের বিরুদ্ধে সংগীতাঙ্গনের সবার সোচ্চার হওয়া উচিত। রাজনৈতিক বিভাজন ও ক্ষোভের সংস্কৃতির বাইরে শিল্পীসমাজকে নিজস্ব মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।
অভিনেতা ও স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান মেহেদী তরু ঘটনাটিকে শুধু একজন শিল্পীর প্রতি অসম্মান নয়, দেশের সংস্কৃতি ও শ্রোতাদের জন্যও গভীর লজ্জার বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, নব্বইয়ের দশক থেকে হাসান তার গান দিয়ে শ্রোতাদের অসংখ্য স্মৃতি উপহার দিয়েছেন। তাঁর প্রাপ্য ছিল সম্মান, অপমান নয়।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে বোতল ছোড়ার মুহূর্ত দেখা গেলেও কে বা কারা এই ঘটনায় জড়িত, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে শিল্পী ও দর্শকদের বক্তব্য এক জায়গায় মিলেছে—ফুটেজ সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ঘটনার বিষয়ে আয়োজকদের অবস্থান পরিষ্কার করা এবং ভবিষ্যতে কনসার্টে শিল্পীদের নিরাপত্তায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















