ঘুষ না দেওয়ায় এক সেবাগ্রহীতাকে হয়রানির অভিযোগের খবর পেয়ে সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসে গিয়েছিলেন স্থানীয় এক তরুণ। অভিযোগ, পরে নিজের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি আড়াল করতে ওই তরুণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) শর্মিষ্ঠা সরকার। এমন দাবি করেছেন ওই তরুণ নিজেই।
নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এনপিবি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই তরুণ দাবি করেন, নিজের স্বার্থ হাসিল এবং দুর্নীতির অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ ঠেকাতেই তাকে সম্পর্কের ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। এর আগেও একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ওই কর্মকর্তার অনৈতিক সম্পর্ক ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
এনপিবি নিউজের অনুসন্ধানে ওই তরুণ ও শর্মিষ্ঠা সরকারের কথোপকথনের একাধিক কল রেকর্ড এবং ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটের স্ক্রিনশট পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্ত বর্তমানে স্থানীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের নানা অভিযোগে এর আগেও আলোচনায় এসেছেন শর্মিষ্ঠা সরকার। কর্মস্থলে নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করায় স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘মাস্ক লেডি’ নামেও পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, সাতক্ষীরা সদর ও ফিংড়ী ভূমি অফিসে একটি দালালচক্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ছাড়া বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করা হতো না। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ভাড়াশিমলা ও বসন্তপুর ভূমি অফিসে কর্মরত থাকার সময়ও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সরকারি তফসিলভুক্ত জমির নামজারি, খাজনা দাখিলা ও প্রতিবেদন তৈরির নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
অভিযোগ অনুযায়ী, সদর ভূমি অফিসে নামজারির জন্য ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা এবং সাধারণ প্রতিবেদনের জন্য ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো।
জমি ও সম্পদের বিষয়েও অভিযোগ
শর্মিষ্ঠা সরকারের বিরুদ্ধে ঘুষের অর্থ দিয়ে কালিগঞ্জে মূল্যবান জমি কেনা, একাধিক বিঘা কৃষিজমি অর্জন এবং ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি ভারতের বশিরহাটে স্বজনের নামে সম্পত্তি কেনার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
তবে এসব সম্পদ ও অর্থের উৎস সম্পর্কে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নামজারিতে টাকা দাবির অভিযোগ
ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের আখড়াখোলা এলাকার বাসিন্দা গীতা রানী আদালতের রায়ের ভিত্তিতে জমির নামজারি করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
তার দাবি, নামজারির জন্য প্রথমে তার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে অনুরোধ ও কান্নাকাটির পর এক লাখ টাকায় বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, শহরের থানাঘাটা গ্রামের ফারুক হোসেনের অভিযোগ, তার জমি-সংক্রান্ত ১৪৫ ধারার মামলার প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অর্থ দাবি করা হয়েছিল। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তাদের পক্ষে প্রতিবেদন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় এর আগে সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন ফারুক।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি অভিযুক্ত কর্মকর্তার
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সরেজমিনে ফিংড়ী ভূমি অফিসে গেলে শর্মিষ্ঠা সরকারের দেখা পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ব্যবহৃত দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়।
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
অভিযোগের বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনি ও দাপ্তরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, এটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিষয় এবং দাপ্তরিক তদন্তের আওতাভুক্ত নয়।
উল্লেখ্য, শর্মিষ্ঠা সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















