ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাখ টাকা শেষ, দুই বাচ্চার হাম নিয়ে এখনও হাসপাতালে

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৮:৪৬:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

আক্রান্ত শিশুদের দেখতে শিশু হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডে ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আক্রান্ত শিশুদের দেখতে শিশু হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডে ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়েছেন, এখনও ওষুধ কিনতে পারিনি। ইতোমধ্যে লাখ টাকার বেশি চলে গেছে। দুই বাচ্চার হাম নিয়ে এখনও হাসপাতালে। কবে সুস্থ হবে জানি না। নিজের কষ্টের কথা এভাবেই জানাচ্ছিলেন হামে আক্রান্ত দুই শিশুর মা ফারজানা আক্তার।

 

প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে হামের চিকিৎসা চলছে ফরহাদ-ফারজানা দম্পতির দুই ছেলে-মেয়ে আরাফাত বায়েজিদ ও ফারিহার। এরমধ্যে বায়েজিদের বয়স ৮ বছর আর ছোট বোন ফারিহা ৫ মাস বয়সি। দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা থেকে আসা দুই শিশু ১৩ দিন ধরে ভর্তি শিশু হাসপাতালে। বাবা ফরহাদ পেশায় একজন রিকশাচালক।

 

পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাস দেড়েক আগে ফারিহার নানাবাড়ি ভোলায় থাকাকালে জ্বর আর পাতলা পায়খানা শুরু হলে তাকে ভোলা জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক দিনের চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলে বাসায় নেওয়া হয়। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক পর আবারও একই জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে নেওয়ার পর হাম সন্দেহে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন চিকিৎসকেরা।

 

উন্নত চিকিৎসায় গত মাসের শেষের দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয় ফারিহাকে। ছোট্ট শিশুটির শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ভর্তির কথা জানান চিকিৎসকেরা। কিন্তু সেখানে না পাওয়ায় মোহাম্মদপুরের বেসরকারি একটি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। যেখানে তিন দিনে ফারিহার পরিবারকে ওষুধসহ গুনতে হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দেয় ফারিহার বড় ভাই বায়েজিদেরও।

 

দুই সপ্তাহ ধরে শিশু হাসপাতালে হামের চিকিৎসা চলছে আরাফাত বায়েজিদ ও ফারিহার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

 

 

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিশু হাসপাতালের হামের চিকিৎসায় বিশেষায়িত ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, একই বেডে চিকিৎসা চলছে দুই ভাই-বোনের। এর মধ্যে ফারিহার শরীরে স্যালাইন চলছে। পাশেই ভাই-বোনের মুখ চেয়ে চোখের পানি ফেলছেন শিশু দুটির মা ও নানি।

 

এ দুই শিশুর মা ফারজানা আক্তার এশিয়া পোস্টকে বলেন, খরচ চালাতে না পেরে আইসিইউ থেকে বের করে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে শিশু হাসপাতালে আসি। অনেক চেষ্টার পর ভর্তি করাতে পেরেছি।

 

তিনি জানান, শিশু হাসপাতালে ভর্তির আগে তিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। যেখানে প্রায় ৭০ হাজার টাকা গেছে। গত ১ মে থেকে এ হাসপাতালে ভর্তি। বেড আর ডাক্তার ফি ছাড়া প্রত্যেকটি ওষুধই এখানে কিনতে হয়, এমনকি সিরিঞ্জটাও। ওষুধ, যাতায়াত, দুজনের খাওয়া মিলিয়ে এখন পর্যন্ত লাখ টাকার বেশি চলে গেছে। আজ সকালেও ছয়টি ওষুধ আনতে দিয়েছে, কিন্তু টাকার অভাবে এখনও কিনতে পারিনি।

 

দুই শিশুর বাবার কথা জানতে চাইলে ফারজানা বলেন, শুরুতে তিনিও এখানে ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা করাতে গিয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ অনেকের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। তাই, গ্রামে গেছে। রিকশা চালালেও কিছু টাকা আসবে এ কারণে। এখানে থাকলে শুধুই খরচ।

 

এ সময় ২ নম্বর ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার দেখভাল, পরামর্শ দিতে দেখা যায় শিশু হাসপাতালের ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলামকে।

 

এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, এখানে যত শিশু ভর্তি, তাদের অধিকাংশই ৯ মাসের কম। প্রত্যেকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুষ্টি ঘাটতির ফলে বাচ্চাদের সেরে উঠতে সময় লাগছে।

 

তিনি বলেন, আক্রান্তদের প্রায় সবারই নিউমোনিয়া থাকছে। এটির বড় কারণ জন্মের পরপর মায়ের বুকের দুধ পর্যাপ্ত পায়নি। এ ছাড়াও গর্ভাবস্থায় মায়ের অপুষ্টির কারণে এমনটা হচ্ছে। এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং বাড়ানো এবং কৌটার দুধের ব্যবহার না কমালে পরিস্থিতি সামনে আরও জটিল হতে পারে।

 

শিশু হাসপাতালের তথ্য বলছে, চলতি বছর হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর এ হাসপাতালে ৬৪৮ জন হামজনিত জটিলতার রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যাদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ৯ মাসের কম। এসব রোগী ঢাকাসহ দেশের ২৫ জেলা থেকে আসা।

 

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত ৮৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিল হাসপাতালটিতে। আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যু হয়েছে ২৯ জন শিশুর। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালটিতে কারও মৃত্যু হয়নি।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

লাখ টাকা শেষ, দুই বাচ্চার হাম নিয়ে এখনও হাসপাতালে

আপডেট সময় ০৮:৪৬:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

আক্রান্ত শিশুদের দেখতে শিশু হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডে ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আক্রান্ত শিশুদের দেখতে শিশু হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডে ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়েছেন, এখনও ওষুধ কিনতে পারিনি। ইতোমধ্যে লাখ টাকার বেশি চলে গেছে। দুই বাচ্চার হাম নিয়ে এখনও হাসপাতালে। কবে সুস্থ হবে জানি না। নিজের কষ্টের কথা এভাবেই জানাচ্ছিলেন হামে আক্রান্ত দুই শিশুর মা ফারজানা আক্তার।

 

প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে হামের চিকিৎসা চলছে ফরহাদ-ফারজানা দম্পতির দুই ছেলে-মেয়ে আরাফাত বায়েজিদ ও ফারিহার। এরমধ্যে বায়েজিদের বয়স ৮ বছর আর ছোট বোন ফারিহা ৫ মাস বয়সি। দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা থেকে আসা দুই শিশু ১৩ দিন ধরে ভর্তি শিশু হাসপাতালে। বাবা ফরহাদ পেশায় একজন রিকশাচালক।

 

পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাস দেড়েক আগে ফারিহার নানাবাড়ি ভোলায় থাকাকালে জ্বর আর পাতলা পায়খানা শুরু হলে তাকে ভোলা জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক দিনের চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলে বাসায় নেওয়া হয়। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক পর আবারও একই জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে নেওয়ার পর হাম সন্দেহে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন চিকিৎসকেরা।

 

উন্নত চিকিৎসায় গত মাসের শেষের দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয় ফারিহাকে। ছোট্ট শিশুটির শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ভর্তির কথা জানান চিকিৎসকেরা। কিন্তু সেখানে না পাওয়ায় মোহাম্মদপুরের বেসরকারি একটি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। যেখানে তিন দিনে ফারিহার পরিবারকে ওষুধসহ গুনতে হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দেয় ফারিহার বড় ভাই বায়েজিদেরও।

 

দুই সপ্তাহ ধরে শিশু হাসপাতালে হামের চিকিৎসা চলছে আরাফাত বায়েজিদ ও ফারিহার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

 

 

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিশু হাসপাতালের হামের চিকিৎসায় বিশেষায়িত ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, একই বেডে চিকিৎসা চলছে দুই ভাই-বোনের। এর মধ্যে ফারিহার শরীরে স্যালাইন চলছে। পাশেই ভাই-বোনের মুখ চেয়ে চোখের পানি ফেলছেন শিশু দুটির মা ও নানি।

 

এ দুই শিশুর মা ফারজানা আক্তার এশিয়া পোস্টকে বলেন, খরচ চালাতে না পেরে আইসিইউ থেকে বের করে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে শিশু হাসপাতালে আসি। অনেক চেষ্টার পর ভর্তি করাতে পেরেছি।

 

তিনি জানান, শিশু হাসপাতালে ভর্তির আগে তিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। যেখানে প্রায় ৭০ হাজার টাকা গেছে। গত ১ মে থেকে এ হাসপাতালে ভর্তি। বেড আর ডাক্তার ফি ছাড়া প্রত্যেকটি ওষুধই এখানে কিনতে হয়, এমনকি সিরিঞ্জটাও। ওষুধ, যাতায়াত, দুজনের খাওয়া মিলিয়ে এখন পর্যন্ত লাখ টাকার বেশি চলে গেছে। আজ সকালেও ছয়টি ওষুধ আনতে দিয়েছে, কিন্তু টাকার অভাবে এখনও কিনতে পারিনি।

 

দুই শিশুর বাবার কথা জানতে চাইলে ফারজানা বলেন, শুরুতে তিনিও এখানে ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা করাতে গিয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ অনেকের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। তাই, গ্রামে গেছে। রিকশা চালালেও কিছু টাকা আসবে এ কারণে। এখানে থাকলে শুধুই খরচ।

 

এ সময় ২ নম্বর ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার দেখভাল, পরামর্শ দিতে দেখা যায় শিশু হাসপাতালের ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলামকে।

 

এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, এখানে যত শিশু ভর্তি, তাদের অধিকাংশই ৯ মাসের কম। প্রত্যেকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুষ্টি ঘাটতির ফলে বাচ্চাদের সেরে উঠতে সময় লাগছে।

 

তিনি বলেন, আক্রান্তদের প্রায় সবারই নিউমোনিয়া থাকছে। এটির বড় কারণ জন্মের পরপর মায়ের বুকের দুধ পর্যাপ্ত পায়নি। এ ছাড়াও গর্ভাবস্থায় মায়ের অপুষ্টির কারণে এমনটা হচ্ছে। এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং বাড়ানো এবং কৌটার দুধের ব্যবহার না কমালে পরিস্থিতি সামনে আরও জটিল হতে পারে।

 

শিশু হাসপাতালের তথ্য বলছে, চলতি বছর হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর এ হাসপাতালে ৬৪৮ জন হামজনিত জটিলতার রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যাদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ৯ মাসের কম। এসব রোগী ঢাকাসহ দেশের ২৫ জেলা থেকে আসা।

 

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত ৮৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিল হাসপাতালটিতে। আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যু হয়েছে ২৯ জন শিশুর। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালটিতে কারও মৃত্যু হয়নি।