মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের হঠাৎ সশস্ত্র সংঘাতের জেরে বাতিল করা হলো বহুল আলোচিত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনার ষষ্ঠ পর্ব। রবিবার (১৫ জুন) ওমানে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও শনিবার (১৪ জুন) বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান ও ওমান উভয় পক্ষ নিশ্চিত করেছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন,

“হ্যাঁ, আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি রোববারের আলোচনা বাতিল।”

এই মন্তব্যের কিছু সময় পরেই ওমান সরকার জানিয়ে দেয়— আলোচনাটি ‘এখন আর অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।’

আলোচনা বাতিলের বিষয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে,

“যখন নির্মম ইসরায়েলি হামলা ইরানকে লক্ষ্য করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।”

ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক হামলা চালায়, তখন থেকেই তেহরান এ আলোচনা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে।

তেহরান দাবি করেছে, এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে।
এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পারমাণবিক আলোচনা ‘অর্থহীন’ বলে অভিহিত করে ইরান সরকার।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন,

“ইরানকে পারমাণবিক হুমকি হয়ে উঠা থেকে যতদিন লাগবে, ততদিন আমরা সামরিক অভিযান চালিয়ে যাব।”

এদিকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে লেখেন:

“আমি ইরানকে আগেই সতর্ক করেছিলাম—তাদের জন্য আরও ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করে, যার অনেকটাই ইসরায়েলের হাতে রয়েছে—এবং আরও আসছে।”

ট্রাম্প একইসাথে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জন্য দায়ী করেন এবং আরও কঠোর হামলার হুমকি দেন।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. হামেদ মুসাভি আল জাজিরাকে বলেন,

“এ মুহূর্তে অধিকাংশ ইরানির মতে, যখন বোমা পড়ছে মাথার ওপর, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বসে কূটনৈতিক আলোচনা করাটা পুরোপুরি অর্থহীন।”

তিনি আরও বলেন,

“ইসরায়েল শুধু ইরানে হামলা চালায়নি, বরং কূটনৈতিক সমাধানের পথও বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয়ে চলছে—এটা আরও উদ্বেগজনক।”

ইসরায়েল হয়তো ভেবেছিল ইরানে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বিক্ষোভ দেখা যায়নি।
মুসাভি বলেন,

“জনগণের মনোভাব এখন প্রতিরোধমুখী। ভবিষ্যতে কী হবে, বলা কঠিন; তবে এই মুহূর্তে ইরানি সমাজে ঐক্য এবং প্রতিরোধের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।”

এই আলোচনা স্থগিতের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কূটনৈতিক সমাধানের শেষ আশাটুকুও যেন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,

“যদি আন্তর্জাতিক মহল এখনই হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে ইসরায়েল-ইরান সংঘাত দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে—যার প্রভাব গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামোকে নাড়িয়ে দিতে পারে।”