২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে মাথায় তিনটি গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন জামালপুরের মাদারগঞ্জের ইমরান হোসেন। দীর্ঘ ২৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে বেঁচে ফিরলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ। মাথায় কৃত্রিম প্লেট বসানো হলেও এখনো তীব্র ব্যথা, শ্রবণশক্তি হারানো, স্মৃতিভ্রংশ ও আচরণগত নানা সমস্যায় ভুগছেন তিনি।
ইমরানের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী ইউনিয়নের চর সুখনগরী তালতলা এলাকার বাসিন্দা তিনি। রিকশাচালক বাবা বিল্লাল হোসেন ও পোশাকশ্রমিক মা নাজরিনের চার সন্তানের মধ্যে ইমরান সবার বড়। নিজেদের বাড়ি না থাকায় নানাবাড়িতে বেড়ে ওঠেন তিনি।
২০২০ সালে তারতাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৩ সালে মাহমুদা বেলাল বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন ইমরান। অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ২০২৪ সালের জুনে ঢাকার আশুলিয়ায় মায়ের কাছে যান। সেখানে জনতা কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারিকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হলে ইমরানও এতে যোগ দেন। ৪ আগস্ট আশুলিয়া থানার সামনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় সামনের সারিতে থাকা ইমরানের মাথায় তিনটি গুলি লাগে। এতে তার মাথার খুলি তিন টুকরো হয়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ২৫ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর প্রাণে বেঁচে যান তিনি। মাথায় দেওয়া হয় ২০টি সেলাই।
পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মাথার খুলিতে কৃত্রিম প্লেট বসানো হয়।
তবে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভুগছেন ইমরান। তার মাথায় প্রায়ই তীব্র ব্যথা হয়। সামান্য স্পর্শেও অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করেন। রাতে ব্যথার কারণে ঘুমাতে পারেন না। ডান কানে এখন আর কোনো শব্দ শুনতে পান না। কানে পানি জমে সংক্রমণও তৈরি হয়েছে।
পরিবারের দাবি, মাথায় আঘাতের পর ইমরানের স্মৃতিশক্তিও দুর্বল হয়ে গেছে। অনেক সময় পরিচিত মানুষকে চিনতে পারেন না এবং হঠাৎ রেগে যান। ফলে নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ প্রয়োজন হলেও পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
জুলাই আন্দোলনে আহত হিসেবে সরকারের কাছ থেকে মাসিক ভাতা পান ইমরান। তবে পরিবারের দাবি, এই অর্থে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই ইমরানের ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি তার বা পরিবারের একজনের সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
ইমরান বলেন, “৪ আগস্ট আমার স্বাভাবিক জীবনটা শেষ হয়ে গেছে। দেশের জন্য আন্দোলনে গিয়ে আজ আমি পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি। কোনো কিছু মনে থাকে না, মাথায় হাত দিলেই যন্ত্রণা হয়। দেশ স্বাধীন হলেও আমার এই জীবনের দায়িত্ব কে নেবে?”
তিনি জুলাই আন্দোলনে আহতদের প্রতি সরকারের আরও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, ইমরান জুলাই আন্দোলনে আহত একজন ব্যক্তি হিসেবে মাসিক ভাতা পাচ্ছেন। তবে ভাতা বৃদ্ধি বা তাকে কিংবা তার পরিবারের কাউকে চাকরি দেওয়ার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে কোনো নির্দেশনা নেই।

ডেস্ক রিপোর্ট 























