পাকিস্তান কখনো ফুটবল বিশ্বকাপে খেলেনি। ২৪ কোটির বেশি মানুষের দেশটির ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বমঞ্চ এখনো অধরাই। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও অবস্থান তলানির দিকে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ফুটবলপ্রেমীদের সামনে আসছে অন্যরকম এক মুহূর্ত।
ইরাকের হয়ে বিশ্বকাপে মাঠে নামলেই জিদান ইকবাল হবেন পুরুষ বিশ্বকাপে খেলা প্রথম পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ফুটবলার। দেশ হিসেবে পাকিস্তান বিশ্বকাপে নেই, কিন্তু পাকিস্তানি শিকড়ের এক ফুটবলার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পা রাখতে যাচ্ছেন।
২৩ বছর বয়সি জিদান ইকবাল জন্মেছেন ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে। তার বাবা পাকিস্তানি, মা ইরাকি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমি থেকে উঠে আসা এই মিডফিল্ডার এখন আছেন নেদারল্যান্ডসের উট্রেখটের ফুটবল কাঠামোয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন ইরাককে।
ইকবালের গল্প শুধু ইরাকের নয়, পাকিস্তানেরও। কারণ, পাকিস্তানের ফুটবল সমর্থকেরা কখনো নিজেদের কোনো প্রতিনিধিকে পুরুষ বিশ্বকাপে খেলতে দেখেননি। সেই অপেক্ষাই শেষ হতে পারে ইরাকের ম্যাচে।
নিজেও এই ইতিহাসের কথা আগে জানতেন না বলে জানিয়েছেন ইকবাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে পাঠান। তার কাছে পাকিস্তানি পরিচয় বাবার দিক থেকে পাওয়া এক গর্বের জায়গা। আবার মায়ের দেশ ইরাকের জার্সি পরে বিশ্বকাপে যাওয়া তার জন্য বড় সম্মান।
এই দুই পরিচয় তিনি নিজের বুটেও বহন করেন। ইকবালের বুটের এক পাশে থাকে ইরাকের পতাকা, অন্য পাশে পাকিস্তানের পতাকা। কেন এমন করেন, তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, দুই দিকের পরিবার, সংস্কৃতি ও শিকড়ের প্রতিই তার সমান শ্রদ্ধা।
ইকবাল বলেন, তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কোন পরিচয়ের সঙ্গে বেশি সংযোগ অনুভব করেন, তার উত্তর দেওয়া কঠিন। তার কাছে দুটিই সমান। একটি তার বাবার দেশ, অন্যটি তার মায়ের দেশ। ইরাকের হয়ে খেললেও পাকিস্তানি শিকড়কে তিনি লুকান না; বরং গর্বের সঙ্গেই বহন করেন।
এটাই জিদান ইকবালের গল্পকে আলাদা করে। পাকিস্তানের ফুটবল বাস্তবতা কঠিন। জাতীয় দল কখনো বিশ্বকাপে পৌঁছাতে পারেনি। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও সাফল্য খুব কম। ক্রিকেটপ্রধান দেশে ফুটবল এখনো বড় লড়াই করছে কাঠামো, সুযোগ ও প্রতিনিধিত্বের জন্য।
সেই প্রেক্ষাপটে ইকবালের বিশ্বকাপ-সম্ভাবনা অনেক তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। বিশেষ করে পাকিস্তানি ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত তরুণদের জন্য। ইউরোপে জন্ম, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড একাডেমি, ইরাকের জাতীয় দল, আর বিশ্বকাপ—এই যাত্রা দেখায়, ফুটবলে পথ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।
ইকবাল নিজেও সেটিই বলতে চান। তার আশা, তাকে দেখে দক্ষিণ এশীয় বা যে কোনো পটভূমির শিশুরা বিশ্বাস পাবে—পেশাদার ফুটবলার হওয়া সম্ভব। কঠোর পরিশ্রম, অঙ্গীকার ও ধৈর্য দরকার, কিন্তু শিকড় বা পরিচয় বাধা নয়।
এটাই তার প্রথম ঐতিহাসিক অর্জন নয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমি থেকে উঠে এসে তিনি ক্লাবটির সিনিয়র দলে খেলা প্রথম ব্রিটিশ দক্ষিণ এশীয় ফুটবলার হিসেবে আলোচনায় এসেছিলেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে তার অভিষেকও দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে বড় ঘটনা ছিল। ইউনাইটেডের সিনিয়র দলে সুযোগ পাওয়া, এরপর উট্রেখটে যাওয়া, আর ইরাকের হয়ে বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া—সব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার শুধু ব্যক্তিগত নয়, প্রতিনিধিত্বের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
ইরাকের জন্যও এই বিশ্বকাপ বিশেষ। ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে তারা। এর আগে তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ ছিল ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে। এবারের বিশ্বকাপেও মেক্সিকো আয়োজক দেশগুলোর একটি, যা ইরাকের জন্য প্রতীকীভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ।
ইরাকের পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘ বাছাইপর্ব, একাধিক রাউন্ড ও প্লে-অফ পেরিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে তারা। গ্রুপে তাদের সামনে কঠিন পরীক্ষা—ফ্রান্স, নরওয়ে ও সেনেগাল। ফ্রান্স দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, নরওয়ের দলে আছেন আর্লিং হলান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের মতো তারকা, আর সেনেগাল আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল।
এই গ্রুপে ইরাক পিছিয়ে থাকা দল। কিন্তু ইকবালের ভাষায়, তাদের হারানোর ভয় কম, পাওয়ার সুযোগ বেশি। বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয় পেলে সেটিই হবে বিশ্বকাপের বড় চমক। আর সেই চমকের অংশ হতে চান তিনি।
জিদান ইকবাল মাঠে নামবেন ইরাকের জার্সিতে। কিন্তু তার বুটে থাকবে পাকিস্তানের পতাকা। ইরাকের সমর্থকদের সঙ্গে পাকিস্তানের অনেক ফুটবলপ্রেমীও তাই চোখ রাখবেন তাঁর দিকে।
পাকিস্তান বিশ্বকাপে নেই। কিন্তু বিশ্বকাপে পাকিস্তানি শিকড়ের গল্প এবার আছে। সেই গল্পের নাম—জিদান ইকবাল।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















